বগুড়ার মহাস্থানগড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে বেরিয়ে এসেছে তেইশশ’ বছরের প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন। সেই সঙ্গে খ্রিষ্টপূর্ব সময়ের প্রত্নসামগ্রীও পাওয়া গেছে এবারের খননে। এরমধ্যে গুপ্তযুগের শেষাংশ থেকে পাল আমলের শুরুর দিকের স্থানীয় গৃহস্থালীর পানি সরবরাহের কূপের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখান থেকে প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রী নিশ্চিত করছে মহাস্থানগড় সেই সুঙ্গ যুগেও ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে ছিল সমৃদ্ধ।
প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন নগরী ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান মহাস্থানগড়ে বাংলাদেশ-ফ্রান্স যৌথ খননকালে এসব নিদর্শনের সন্ধান মেলে। গত ২৮ অক্টোবর থেকে ১৮তম খনন কাজ শুরু হয় মহাস্থানগড়ে। ফ্রান্সের প্রতিনিধি দলটি ২৯ নভেম্বর তাদের খনন কাজ শেষ করলেও স্থানীয়ভাবে খনন কাজ অব্যাহত রয়েছে। এবার খননে যেসব স্থাপত্য নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া গেছে তা খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দ থেকে শুরু হয়ে মুসলিমপূর্ব যুগের নির্দেশ করছে- এমনটাই দাবি প্রত্নতাত্ত্বিকদের।
মহাস্থানগড় ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে খনন করা হয়েছে। খননের বিভিন্ন পর্যায়ে এখানে বেরিয়ে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ সব প্রত্ননিদর্শন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সাল থেকে বাংলাদেশ ও ফ্রান্স সরকার যৌথভাবে খনন কাজ পরিচালনা করে আসছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে ১৭ দফায় এখানে খনন কাজ চালানো হয়েছে। এবার শুরু হয় ১৮তম খনন কাজ। মহাস্থান দুর্গ নগরীর মাঝামাঝি এলাকা লইয়েরকুড়ি বা ফ্রান্স মাঠ নামে পরিচিত ভিটায় এই খনন কাজ চালানো হয়। এই ভিটার উত্তর-পশ্চিম কোণে বৈরাগীর ভিটা, দক্ষিণ পাশে পরশুরাম প্যালেস ও জিয়তকূপ, পূর্ব পাশে শিলাদেবীর ঘাট এবং উত্তর ও পশ্চিম পাশে উন্মুক্ত মাঠ অবস্থিত।
এবারের খননে সেখানে একটি প্রাচীন কূপের সন্ধান মিলেছে। প্রায় ৯ ফুট গভীর কূপটির চারপাশ ইটের পাচিল দিয়ে ঘেরা। খননকাজে নিযুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা গুপ্তযুগের শেষাংশ থেকে পাল আমলের শুরুর দিকে স্থানীয় গৃহস্থালীর পানি সরবরাহের উদ্দেশ্যে কূপটি খনন করা হয়। এর পাশেই উন্মোচিত হয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দের স্থাপত্য শৈলী।
এবারের খননকাজে নেতৃত্বে ছিলেন ফ্রান্সের পক্ষে আট সদস্যের প্রতিনিধি দল। এদের মধ্যে দলনেতা ছিলেন খনন বিশেষজ্ঞ কোলিন লেফনারেক। এছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে খননকাজে নিযুক্ত ৬ সদস্যের দলের ফিল্ড ডাইরেক্টর হিসেবে ছিলেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা। এছাড়াও দলনেতা হিসেবে ছিলেন মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান মজিবর রহমান।
দলের অন্যতম সদস্য মহাস্থান জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান এসএম হানাত বিন ইসলাম জানান, এবার খননকালে সেখানে স্থাপত্য শৈলীর পাশাপাশি বেশকিছু প্রত্নবস্তুর সন্ধান মিলেছে। তার মধ্যে রয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ অব্দের ছাপাঙ্কিত ব্রোঞ্জের মুদ্রা, সুঙ্গযুগীয় টালির (টাইলস) ভগ্নাংশ, উত্তরাঞ্চলীয় উজ্জ্বল চকচকে কালো মৃত্পাত্র, বিভিন্ন যুগের মৃত্পাত্রের ভগ্নাংশ, পোড়া মাটির বাটি, পোড়া মাটির গুটিকা, পোড়া মাটির ছিদ্রযুক্ত গুটিকা, পাথরের গুটিকা ও কাঁচের গুটিকা।
মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান মজিবর রহমান জানান, দীর্ঘদিন বিরতির পর আবার লইয়েরকুড়ি নামের এই ভিটায় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন করা হয়েছে। পাকিস্তান আমলে এখানে প্রথম খনন করা হয়। সেই সময় দুটি প্রাচীন মন্দিরের সন্ধান মিলেছিল।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা জানান, মহাস্থানগড়ের প্রাচীনত্ব বিশ্বস্বীকৃত। সেই স্বীকৃতির নিদর্শনই প্রতি বছরের খননকাজে উন্মোচিত হচ্ছে। এবার সেখানে যে টাইলসের নমুনা মিলেছে তা প্রমাণ করে খ্রিষ্টের জন্মের পূর্বেও এই জনপদ কতোটা সমৃদ্ধ ছিল। সেই সময়েও মানুষ টাইলসের ব্যবহার করেছে। তিনি বলেন, এবার খননে যেসব স্থাপত্য নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া গেছে তা খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দ থেকে শুরু হয়ে মুসলিমপূর্ব যুগের নির্দেশ করছে।
ইত্তেফাক/নূহু
