ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িতরা আগের দিন ছাদে গিয়ে রেকি করে। মাদ্রাসার সেই ভবনটির সামনে জড়িতরা দাঁড়িয়ে সেলফিও তোলে। এলাকাবাসী, নুসরাতের আত্মীয়-স্বজন ও মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষার্থী জানান, মোবাইল ফোনে তাদের ছবি দেখে জড়িতদের চেনা গেছে। তাদের মধ্যে মাদ্রাসার ফাজিল প্রথম বর্ষের ছাত্র নুরুদ্দিনসহ একাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। নুরুদ্দিন অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজদ্দৌলার অনুগত এবং তার অনেক ঘটনার সাক্ষী। এই নুরুদ্দিন ২০১৭ সালে মাদ্রাসা থেকে বাসায় ফেরার পথে নুসরাতের মুখে চুন মেরেছিল। সেই থেকে নুরুদ্দিন বিভিন্ন সময়ে নুসরাতকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। এদিকে নুসরাত তার খাতার পাতায় অধ্যক্ষের যৌন নিপীড়নের ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
ঘটনার দিন পরীক্ষা চলাকালে ওই কেন্দ্রে একজন পুলিশ অফিসার ও তিনজন কনস্টেবল কর্তব্যরত ছিলেন। পরীক্ষা শুরুর প্রাক্কালে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ঘটনার পর জড়িতরা মাদ্রাসার ক্যাম্পাসে ঘোরাফেরা করে। জড়িতরা শিক্ষার্থী, এলাকাবাসী ও নুসরাতের আত্মীয়-স্বজনের অনেকেরই পরিচিত। তাদের অপকর্ম সম্পর্কে তারা সবই জানে। নুসরাতকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার পর জড়িতরা নিরাপদে মাদ্রাসা ক্যাম্পাস থেকে যাতে যেতে পারে সেই ব্যবস্থাও করে রাখা হয়। নুসরাত তার খাতার দুই পৃষ্ঠায় সহপাঠীদের উদ্দেশে লিখেছেন, “তোরা সিরাজুদ্দৌলা সম্পর্কে সব জানার পরও কিভাবে তার মুক্তি চাইতেছিস, তোরা জানিস না ঐদিন ক্লাসে কি হইছে, উনি আমার কোন জায়গায় হাত দিয়েছে এবং আর কোন জায়গায় হাত দেওয়ার চেষ্টা করছে। উনি আমাকে বলছে, নুসরাত ঢং করিও না। তুই প্রেম করিস না, ছেলেদের সঙ্গে প্রেম করতে ভাল লাগে? ওরা তোরে কি দিতে পারবে, আমি তোকে পরীক্ষার সময় প্রশ্ন দেব।” নুসরাতের হাতে লেখা দুই পৃষ্ঠার মধ্যে একটি অংশ এটি।
এই ঘটনাকে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে নুসরাতের আত্মীয়-স্বজন অভিযোগ করেন। এমনকি পুলিশের শীর্ষ প্রশাসনকে ঘটনা সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য সেদিন স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন জানায়নি। এ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের পর পুলিশ প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এ ঘটনায় নড়েচড়ে বসে। গতকাল বুধবার সোনাগাজীর ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়। নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে। অধ্যক্ষ সিরাজদ্দৌলাসহ তিনজনকে নেওয়া হয়েছে রিমান্ডে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক শ্রেণির নেতা-কর্মীদের মোটা অংকের উেকাচ দিয়ে অতীতের সকল নারী কেলেঙ্কারির ঘটনা থেকে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ রেহাই পান। একইভাবে তিনি পুলিশ প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ম্যানেজ করেছেন। সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় চাকরি নেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতাকে মোটা অংকের টাকা ঘুষ দেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সর্বশেষ তার যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে নুসরাতকে। জানা গেছে, নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা থেকে রেহাই পেতে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতাকে মোটা অংকের টাকা ঘুষ দিয়েছেন ওই অধ্যক্ষ। পরে ঘুষ দেওয়ার ঘটনাটি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জেনে যাওয়ায় ঢাকায় এসে ওই নেতা আত্মগোপনে আছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন জানান, প্রভাবশালী ওই নেতা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
ফেনী প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান খান জানান, ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসা ছাত্রী আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুনের ঘটনায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলা, ইংরেজি শিক্ষক নুরুল আবছার ও আলিম ছাত্র আরিফকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ৩ জনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
সোনাগাজী থানার এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওসি (তদন্ত) কামাল উদ্দিন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সরাফ উদ্দিনের আদালতে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। আদালত অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলাকে ৭ দিনের রিমান্ড ও বাকি ২ জনের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এদিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খোন্দকার গোলাম ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে আনসার ব্যাটেলিয়নে বদলি করার কথা জানান।
অপরদিকে এই মামলার তদন্তভার পিবিআইকে (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) দেওয়া হয়েছে। সোনাগাজী থানার এএসপি (সার্কেল) সাইকুল আহম্মেদ ভূঁঞার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আগুনের ঘটনায় আটক ১০ জন ছাড়া এখনো কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়নি। এদিকে এলাকার কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি জানান, ঘটনার পূর্বে উক্ত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মো. সিরাজউদ্দৌলা তার অনুগত ছাত্র নুরউদ্দিনের নেতৃত্বে ৫ জনকে কক্সবাজারে আনন্দ ভ্রমণে পাঠান। তারা আনন্দ ভ্রমণ করে আসার পর এই ঘটনা ঘটান।
এলাকাবাসী ও মাদ্রাসা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, আটক দারোয়ান মোস্তফা, নৈশপ্রহরী নুর ইসলাম এবং মাদ্রাসার দপ্তরির ছেলে আবু ইউসুফ ও ছাত্র নুরউদ্দিনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সকল তথ্য বেরিয়ে আসবে। দপ্তরির ছেলে আবু ইউসুফ অধ্যক্ষের একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করত। তার পিতা আবুল কাশেম উক্ত ফাজিল মাদ্রাসার বেতনভুক দপ্তরি হলেও সে অধ্যক্ষের নিকটতম আত্মীয় বলে জানা যায়। রহস্যজনকভাবে নুসরাতের ঘটনার পূর্বেই দপ্তরি আবুল কাশেমকে ছুটি দিয়ে তার ছেলে আবু ইউসুফকে কাজে নিয়োগ করেন অধ্যক্ষ। ২০১৬ সালে তিনি ভয়-ভীতি দেখিয়ে মাদ্রাসার এক ছাত্রীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেন। ওই ছাত্রী পরে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। এই ঘটনাটি এলাকার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সহযোগিতায় ধামাচাপা দিয়ে তিনি বেঁচে যান। ফেনী সদর উপজেলায় ধলিয়ার সালামতিয়া দাখিল মাদ্রাসায় সহকারী অধ্যক্ষ থাকাকালীন সিরাজউদ্দৌলা সেখানে মেয়েদের বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানি করেছেন। এ ধরনের আরো অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
গত ৭ এপ্রিল রাতে পুলিশ প্রথমে গণমাধ্যমকে শম্পাসহ ৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে বলে জানালেও পরে তারা শম্পাকে আটক করার বিষয়টি অস্বীকার করেন। এদিকে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা জানান, পুলিশ যে উম্মে সুলতানা পপিকে আটকের কথা স্বীকার করেছে, সে গ্রেফতারকৃত অধ্যক্ষের শালীর মেয়ে। তারই ছদ্মনাম ‘শম্পা’ হিসেবে সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করেছে বলে নুসরাতের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
