আর মাত্র তিনদিন পরে বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় উৎসবের দিন পহেলা বৈশাখ। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই আসছে মুসলিম উম্মাহর এবাদত ও উৎসবের মাস পবিত্র মাহে রমজান। এসব দিনগুলো নিয়ে সবাই যখন নানান পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন, তখন চাকরি হারানোর ভয়, আর নিজের অজানা ভবিষৎ নিয়ে দুমড়েমুচড়ে মরছেন ৮৭৬ জন পলিটেকনিক কলেজের শিক্ষক। ৩০ জুনের পর তাদের কপালে কি আছে সেই চিন্তায় তাদের ঘুম হারামের অবস্থা।
জানা গেছে, কারিগরি শিক্ষার মানউন্নয়নে ২০১০ সালে দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প (স্কিলস এন্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট-স্টেপ) নামে একটি প্রকল্প চালু করে সরকার। নিয়োগের দীর্ঘসূত্রিতা এড়াতে প্রকল্পের অধীনে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ৫৭৬ জন এবং ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ৫৫০ জনসহ মোট ১১২৬ জন শিক্ষক প্রকল্প থেকে নিয়োগ দেয়া হয়। পরে চাকরি অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই চাকরি ছেড়ে চলে গেলেও উন্নয়ন খাতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৮৭৬ জন শিক্ষক। দুই দফা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৯ সালের জুনে শেষ হচ্ছে প্রকল্পটি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় চাকরি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন প্রকল্পের অধীনে নিয়োগ হওয়া এসব শিক্ষকেরা।
এসব শিক্ষকদের নিয়োগ প্রকল্পের অধীনে হলেও ভূমিকা রাখছেন রাজস্ব খাতে। রাজস্ব খাতের ৮৪০ জন শিক্ষকের মধ্যে প্রায় ৭০০ জন শিক্ষক রয়েছেন ঢাকাসহ আটটি বিভাগীয় শহরে। ফলে রাজধানীর বাইরে জেলা শহরের ৩৭টি পলিটেকনিক চলছে স্টেপ প্রকল্পের শিক্ষক দিয়েই। এসব পলিটেকনিকের কর্মরত ২৫/৩০ জন শিক্ষকের মধ্যে রাজস্বখাতভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন ৪/৫ জন।
এ বিষয়ে আইডিইবির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি একেএমএ হামিদ বলেন, সপ্তম পঞ্চমবার্ষিকী উন্নয়ন পরিকল্পনায় বারবার বলা হয়েছে দক্ষ কর্মশক্তির অভাব, দক্ষ কর্মীর অভাব। অথচ আপনারা মাত্র ৮৭৬ শিক্ষক। লাখ লাখ দক্ষ কর্মীর অভাব, সেখানে এসব দক্ষ কর্মীদের কর্মক্ষেত্র থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে। তাদেরকে প্রয়োজন আমাদের।
আইডিইবির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. শামসুর রহমান বলেন, ২০১২ সালে আইডিবি যখন আন্দোলন করছিলো শিক্ষক স্বল্পতা নিয়ে, সে সময় সরকার স্টেপ প্রকল্পের আওতায় ১০১৫ জনকে নিয়োগ করে। ওই নিয়োগ না দিলে কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব ছিলো না। রাজস্ব খাত থেকে বর্তমানে মাত্র ৬৫০ জনের মতো কারিগরি শিক্ষক রয়েছে। সে কারণেই এখনো এই প্রায় ৮৭৬ শিক্ষক না থাকলে আবারো ধ্বসে পড়বে কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা।
এ সময় উপস্থিত স্টেপ প্রকল্পের আওতায় থাকা শিক্ষকগণ জানান, দুই বছরের প্রকল্পের মেয়াদ দুই ধাপে বৃদ্ধি করে ৭ বছরে উন্নীত করা হয়। কিন্তু আগামী ৩ মাস পর হঠাত্ করেই প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়া হবে। আমাদের ৮৭৬ শিক্ষক ও তাদের পরিবারের ভবিষ্যতের কী হবে, আমাদের কর্মসংস্থানের কী হবে? আমাদের অধিকাংশদের বয়স এখন ৩০ বছরের বেশি। আমরা কী করব? তাই দাবি জানাচ্ছি আমাদেরকে রাজস্বখাতে আত্মীকরণ করা হোক।
বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা প্রকৌশলী খবির হোসেন বলেন, যে মার্চে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছে, যে মাস উদযাপনের, সেই মাসে আহাজারি করছে প্রায় ৯'শ শিক্ষক। জুন মাস থেকে যদি স্টেপের শিক্ষকেরা না থাকে তাহলে ৪৯ কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতে ১৭/১৮ জন শিক্ষক থাকবে না। এভাবে কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে। মানবতার মা প্রধানমন্ত্রী যদি ১০-১২ লাখ রোহিঙ্গাকে খাওয়াতে পারে, তাহলে এই ৮৭৬ শিক্ষকের জন্যও ব্যবস্থা করবেন তিনি।
বিপিটিএফ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশ গঠনে কাজ করে যাচ্ছেন যেখানে বড় অবদান রাখছে কারিগরি শিক্ষা। আর সেই কারিগরি শিক্ষার অগ্রযাত্রায় 'স্টেপ' প্রকল্পের শিক্ষকদের রয়েছে বড় অবদান। এ কারণেই ৮৭৬ শিক্ষক ও তাদের পরিবারের রুটি রুজির বিষয় নিয়ে সকলের ভাবা উচিত। তারা না থাকরে কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
