কর্দোবার ইহুদিপল্লীর পুয়ের্তা দে আলমোদোভার বা আলমোদোভার গেট দিয়ে না ঢুকে পুরনো দেয়ালের বাইরের প্রতিরক্ষা পরিখা ধরে এগিয়ে গেলে কাম্পো দে লস সান্তোশ মার্তিরেস, সেখানে একটা হেলাফেলা করে দাঁড় করানো সাইনবোর্ডের গোড়া থেকে ঢালুপথ নেমে গেছে খলিফাদের হাম্মামখানায়, নেমে গেছে মানে হাম্মামটি ভূগর্ভস্থ। কর্দোবাতে একসময় নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য উন্মুক্ত ছিল অসংখ্য গণহাম্মাম, তবে মেয়েদের ব্যবহারের আলাদা সময়সূচি ছিল। এসব গণহাম্মামের অধিকাংশের মালিকানা ছিল মসজিদের, যাতে ওগুলোর আয় দিয়ে মসজিদগুলোর খরচ চালানো যায়। ইউরোপীয় কায়দায় গ্রীষ্মের মোষের মতো বাথটাবে গা ডুবিয়ে শুয়ে থাকার বদলে আরবীয় হাম্মামগুলোতে গায়ে পানি ঢেলে পরিষ্কার করার রেওয়াজটা ছিল বেশি চালু। এসব জায়গায় ধনবান লোকদের শরীর ঘষামাজার কাজটি করত ভৃত্য ও পরিচারকরা। স্টিমবাথ কিংবা হটবাথের ব্যবস্থাও ছিল চিকিত্সার অংশ হিসেবে। হাম্মামগুলো শুধু গোসলের জন্য নয়, অনেক ক্ষেত্রে মানুষের বিনোদন এবং আধুনিক ক্লাবের মতো জনসংযোগের সম্মিলনস্থলও ছিল।
১৯০৩ সালে এক নির্মাণকাজের সময় হদিস পাওয়া যায় এই রাজকীয় হাম্মামখানাটির। ১৯৬০-এর দশকের প্রথমদিকে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি মাটি খুঁড়ে বের করা হলে এটিকে জাদুঘরে পরিণত করা হয়। এখানে ঢোকার টিকিট জনপ্রতি দুই ইউরো, ছাত্রদের জন্য এক ইউরো। আমাদের ছেলেমেয়ে দুজনই ছাত্র বলায় বিনাবাক্যব্যয়ে কাউন্টারের লোকটি ছাড় দিয়ে দেয়। আমাদের দেশে এরকম ক্ষেত্রে ছাত্রত্বের আইডি কার্ড চেয়ে বসতো নির্ঘাত।
প্রাচীন ইসলামি স্থাপত্যমণ্ডিত স্তম্ভ ও ধনুকাকৃতি খিলান সম্বলিত কুঠুরিগুলোর বেশ কয়েকটি প্রায় অক্ষত অবস্থায় আছে এখনো। এগুলোতে পানি সরবরাহ করা হতো গুয়াদালকিভির (নামটি এসেছে আরবি আল ওয়াদি আল কবির থেকে, যার অর্থ বিরাট নদী) নদী থেকে। বিভিন্ন তাপমাত্রার জল সরবরাহের জন্য এখানে লাগানো ছিল বয়লার, পাইপ—এসব। হাম্মামের স্নানার্থীরা প্রথমে যেতেন বায়তাল মাসলাজ বা পোশাক বদলের ঘরে। সেখান থেকে বায়তাল বারিদ বা ঠাণ্ডা ঘরে। এখানে অজু করার সাথে ভিন্ন পোশাক এবং ‘আলকর্কে’ নামের শোলার তৈরি বিশেষ ধরনের চপ্পল দেওয়া হতো তাঁদের যাতে পা পিছলে না যায়। এখান থেকে তাঁরা যেতেন বায়তাল ওয়াসতানি বা ঈষদুষ্ণ ঘরে, এখানে হতো বাষ্পস্নান। তারপর বায়তাল সাজুন বা উষ্ণ ঘরে, এখানে ডুব গোসল এবং ধারাস্নান উভয়েরই ব্যবস্থা ছিল। এই উষ্ণ কক্ষ ছিল হাম্মামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটার সাথে ছিল শরীর পরিচর্যার বিভিন্ন সুবিধা। খলিফা এখানে কেশচর্চা, ক্ষৌরি, মাসাজ—এসব কাজ করাতেন। এখানে কখনো কখনো উচ্চপদস্থ আমাত্য কিংবা অতিথিদেরও আপ্যায়ন করা হতো। এই হাম্মাম প্রথমে তৈরি করা হয় দ্বিতীয় আল হাকামের (৯৬১—৯৭৬) সময়। সে সময় কর্দোবা ছিল আল আন্দালুসের রাজধানী। বলাবাহুল্য আমরা যেটিকে আন্দালুসিয়া বলে জানি সেটি ছিল আটটি প্রদেশ সম্বলিত স্পেনের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল যা মুসলমান শাসনাধীনে ছিল।
হাম্মামটি কর্দোবার ইতিহাসে দুটি মর্মন্তুদ ঘটনারও সাক্ষী। মরক্কান বংশোদ্ভূত খলিফা আলি ইবন হাম্মুদ (১০১৬-১০১৮) এখানেই তাঁর দাসদের হাতে খুন হয়েছিলেন। তার কয়েক বছর পর কর্দোবায় অবস্থানরত আফ্রিকান বাহিনীর প্রতি পক্ষপাতিত্বের কারণে উমাইয়া খলিফা পঞ্চম আবদ আল রহমান ১০২৪ সালের জানুয়ারিতে কর্দোবার বিদ্রোহী জনতার হাতে ধরা পড়ে এখানেই নিহত হয়েছিলেন।
পুরো ইহুদিপল্লী ঘুরে এসে গুয়াদালকিভির নদীর ওপর দৃষ্টিনন্দন এক সেতু দেখে দাঁড়াতে হয়। সম্রাট অগাস্টাসের আমলে তৈরি বলে নাম ‘রোমান ব্রিজ,’ তবে মূল সেতুটি এখন আর নেই, নতুনভাবে তৈরি। ওপারে বিশাল খাড়া করা পিপের মতো মেটে রঙের কালাহোরা টাওয়ার। ‘কালাহোরা’ নামের উত্পত্তি আরবি ক্কালাত বা দুর্গ এবং ‘হার্রা’ বা মুক্ত থেকে, অর্থাত্ মুক্ত দুর্গ। আলমোহাদ শাসনামলে এ দুর্গ তৈরি করা হয় রোমান সেতুটি রক্ষা করার জন্য। আরবি আল-মুয়াহিদুন থেকে মরক্কান বংশোদ্ভূত রাজবংশটির নাম আলমোহাদ (১১২০—১২১২)। অষ্টাদশ শতাব্দীতে দুর্গটি ব্যবহূত হতো অভিজাত শ্রেণির কারাগার হিসেবে, তারপর এখানে স্থাপন করা হয় সেনা এবং বেসামরিক রক্ষী বাহিনীর সদর দফতর। তারপর ১৯৩১ সাল থেকে আজ অবধি এটি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত।
রোমান ব্রিজের এপারে পুয়ের্তা দেল পুয়েন্তে অর্থাত্ সেতুর তোরণ। এটিকে কেবল তোরণ না বলে তোরণ স্তম্ভ বলা উচিত। বিশাল চওড়া নজরকাড়া এই ফটকটি আদিতে নগরীর প্রতিরক্ষা দেয়ালের অংশ ছিল। ১২৩৬ সালে খ্রিস্টানদের পুনর্বিজয়ের পর সংস্কার করা হলে এটার নতুন নাম হয় আলখেসিরাস গেট। রোমান সেতু পার হয়ে আলকাজার প্রাসাদ এবং মেসকিতা এলাকায় ঢোকার জন্য দৃষ্টিনন্দন এই ফটকটি চতুর্দশ শতাব্দীতে নতুন নকশায় তৈরি করা হয় স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের (১৫২৭—১৫৫৮) কর্দোবা আগমন উপলক্ষে। এটির দু পাশে দুই জোড়া করে মোট চার জোড়া গোল থামের ওপর চওড়া লিন্টেলের ছাদ, তার ওপর রাজকীয় প্রতীক খোদাই করা ধনুকাকৃতির একপ্রস্থ দেয়াল। দু পাশের জোড়া থামের পেছনের দেয়ালের ওপরের অংশে মোট চারটি খোদাই করা ভাস্কর্য-ম্যুরাল উত্কীর্ণ। বিকেলের তীব্র আলোয় মেটে রঙের প্রাচীন সিংহদ্বারটি ঝকঝক করছিল।
এটি পেরিয়ে বামে গেলে আলকাজার দে লস রেয়েস খ্রিস্তিয়ানোস অর্থাত্ খ্রিস্টান সম্রাটদের দুর্গ বা প্রাসাদ। স্পেনীয় ‘আলকাজার’ অর্থ দুর্গ বা নগরদুর্গ শব্দটি এসেছে সরাসরি আরবি ‘আল-কাসর’ থেকে। এটি ছিল একাধারে দুর্গ এবং প্রাসাদ দুটোই। বস্তুত প্রথম আবদুর রহমানই এই দুর্গকে খলিফার প্রাসাদ হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছিলেন। এই খেলাফতের সময় থেকেই কর্দোবা রাজনীতি, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হতে শুরু করে। দুর্গটিতে হাম্মামখানা, বিশাল প্রশস্ত বাগিচা এবং খুব সমৃদ্ধ কুতুবখানার সমাবেশ ঘটানো হয়। এখানকার গ্রন্থাগারটিকে পশ্চিমের সবচাইতে বড় কুতুবখানা হিসেবে গণ্য করা হতো। প্রাসাদের বাগানে পানি সরবরাহ করা হতো পাশের গুয়াদালকিভির নদী থেকে সেচযন্ত্র দিয়ে।
চার ইউরো করে টিকিট কেটে আমরা যখন আলকাজারের ভেতর ঢুকি তখন ঘড়ির কাঁটায় বিকেল হলেও সূর্যের চেহারা এবং মেজাজ দেখে গনগনে দুপুরের মতো বেলাকে মোটেই বিকেল বলে মনে হচ্ছিল না। দুর্গের যে উঁচু টাওয়ারটি দৃশ্যমান আছে, রোদ এবং দীর্ঘ হাঁটার ক্লান্তিতে সেটিতে চড়ার উত্সাহ বা শক্তি কারোরই অবশিষ্ট নেই। প্রাসাদ হিসেবে ব্যবহূত হলেও দুর্গটির চেহারা কাঠখোট্টা, গম্ভীর এবং কিছুটা বিদেশি সিনেমায় দেখা কারাগারের মতো। মুসলিম স্থাপত্যের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য সুষমত হলেও দুর্গের চারপাশের টাওয়ারগুলোর আকৃতি সুষম নয়, অর্থাত্ চারটি চার ধরনের, দুটো চতুষ্কোণ, একটি গোল এবং আরেকটি অষ্টভুজা। এখন অবশ্য টাওয়ার আছে তিনটি, একটি ভেঙে পড়েছে। এগুলোর ছিল আলাদা আলাদা নাম, যেমন সিংহ টাওয়ার, বিচারিক টাওয়ার, শ্রদ্ধার টাওয়ার ইত্যাদি। পায়ে চলা সরুপথ দিয়ে টাওয়ারগুলোর একটি থেকে আরেকটিতে চলাচল করত সান্ত্রীরা। আমরা যে ফটক দিয়ে ঢুকি সেটি সিংহ টাওয়ারের নিচ দিয়ে।
খ্রিস্টানদের কর্দোবা পুনর্বিজয়ের প্রায় শ খানেক বছর পর ১৩২৮ সালে সম্রাট একাদশ আলফনসো দুর্গটিকে সংস্কার এবং পুননির্মাণ করান। রাজা ফার্ডিনেন্ড এবং রানি ইসাবেলা এই প্রাসাদে বাস করেন প্রায় আট বছর। ভারত মনে করে, ভুলক্রমে আমেরিকা আবিষ্কারের আগে কলম্বাস এই দুর্গ-প্রাসাদে এসেই রাজার কাছে তাঁর অভিযানের খরচ মেটানোর জন্য সাহায্য চেয়েছিলেন। বস্তুত কলম্বাস বেশ কয়েক বছর ধরে পূর্বদিকে ভারতের সাথে একটা সংক্ষিপ্ত বাণিজ্যপথ আবিষ্কারের জন্য অভিযানে যাওয়ার খরচ জোগাড়ের চেষ্টা করছিলেন। ফার্ডিনেন্ড-ইসাবেলা দম্পতি এই সমুদ্রযাত্রার সফলতার সম্ভাব্যতা যাচাই করার জন্য নাছোড়বান্দা ইতালীয় অভিযাত্রীরটির পরিকল্পনা এবং ভ্রমণপথের ম্যাপ ইত্যাদি পরীক্ষা করতে দিয়েছিলেন কয়েকজন বিশেষজ্ঞের একটা কমিশনকে। তাঁরা কলম্বাসের পরিকল্পনার পক্ষে রায় না দিলেও রাজা-রানির কাছে প্রকল্পটা আকর্ষণীয় বলে মনে হয়। সে সময় পশ্চিম আফ্রিকান উপনিবেশ ছেড়ে দেওয়া এবং গ্রানাদাতে মুরীয় শাসনের অবসানের কারণে রাজ্যের আয় কমে যাচ্ছিল। আবার কলম্বাসের অভিযানটার সাফল্য সম্পর্কেও তাঁদের খুব একটা উচ্চাশা ছিল না। তাঁদের অনীহা আঁচ করতে পেরে কলম্বাস ফ্রান্সের রাজার কাছে সাহায্যের আবেদন করার কথা চিন্তা করছিলেন। কয়েকবারের ব্যর্থ চেষ্টার পর শেষ চেষ্টা হিসেবে কলম্বাস রাজা ফার্ডিনেন্ডের নিয়োজিত কমিশনের সামনে আরো একবার হাজির হন অবরুদ্ধ গ্রানাদার উপকণ্ঠে। উল্লেখ্য, মুসলিম শাসনের শেষ সুলতানকে পরাভূত করার উদ্দেশ্যে তখন চলছিল খ্রিস্টানদের গ্রানাদা অবরোধ। এবারও তাঁর নিবেদন অগ্রাহ্য হয়। বিফল মনোরথ হয়ে কলম্বাস কর্দোবা ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ করেন ফ্রান্স যাত্রার উদ্দেশে। শেষ পর্যন্ত বহু অগ্রপশ্চাত্ বিবেচনা করে রাজা ফার্ডিনেন্ড সেই উচ্চকাঙ্ক্ষী অভিযাত্রার খরচ জোগাতে রাজি হয়েছিলেন। কলম্বাস যে এই অভিযাত্রা থেকে জ্যান্ত ফিরবেন তাঁর সে আশা ছিল ক্ষীণ, তবুও জুয়াড়ির মতো প্রকল্পের আগাম মুনাফার ওপর বাজি ধরেন তিনি। অবশেষে ১৪৯২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজা ফার্ডিনেন্ড এবং রানি ইসাবেলা কলম্বাসের সাথে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করেন। স্পেনের পালোস বন্দর থেকে সে বছরের অগাস্টে তিনটি জাহাজ নিয়ে কলম্বাস যাত্রা করেন ভারতের উদ্দেশে। তাঁর সেই দুঃসাহসিক অভিযান কোথায় শেষ হয়েছিল সেই ইতিহাস আমাদের জানা।
কর্দোবার এই আলকাজার থেকেই মুসলমান শাসকদের কাছ থেকে গ্রানাদা পুনর্দখল করার প্রচারণা এবং অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রাজা ফার্ডিনেন্ড। এসময় গ্রানাদার সুলতান ছিলেন আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ (১৪৬০—১৫৩৩), স্পেনীয় ভাষায় তাঁকে বোয়াবদাল নামে ডাকা হতো। ১৪৯১ সালে ফার্ডিনেন্ড তাঁকে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেন, কিন্তু আবদুল্লাহ বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করতে রাজি ছিলেন না। ফলে গ্রানাদা অবরোধ করে রাখা হয় দীর্ঘদিন। অবশেষে ১৪৯২ সালে আবু আবদুল্লাহ আত্মসমর্পণ করেন, সেইসঙ্গে সমাপ্তি ঘটে ইউরোপে মুসলমান শাসনের। তাঁকে কর্দোবায় নিয়ে এসে এই আলকাজারেই বন্দি করে রাখা হয়েছিল।
গ্রানাদার পতনের পর আলকাজার খ্রিস্টান ধর্মসভার বিচারিক পর্ষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রায় সোয়া তিনশ বছর পর এই পর্ষদ অবলুপ্ত করা হলে এটি ব্যবহূত হতো সামরিক-বেসামরিক কারাগার হিসেবে। ১৯৫১ সালে কর্দোবার পৌর কর্তৃপক্ষ ঐতিহাসিক স্থাপনাটির দায়িত্ব গ্রহণ করে। বর্তমানে ইউনেস্কো ঘোষিত হেরিটেজ সাইট এটি।
টাওয়ারে না চড়লেও দুর্গের নিচতলায় ঘুরে ঘুরে পাঁচশ বছরেরও প্রাচীন দুর্গটির অন্ধিসন্ধি দেখাও কম আয়াসসাধ্য ছিল না। সম্রাট অগাস্টাসের আমল থেকে বিভিন্ন শাসকের হাতে দুর্গটির বহুধরনের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুসলমান শাসকদের আমলে এটি ছিল সেনা ছাউনি। আবার ত্রয়োদশ শতাব্দীতে খ্রিস্টান পুনর্বিজয়ের পর পরিণত হয় শাসকদের প্রাসাদ ও দুর্গ—উভয়েই। সে সময়কার কাঠামোর বেশিরভাগ অংশই এখন অস্তিত্বশীল। সে আমলে খ্রিস্টধর্মের শুদ্ধতা রক্ষায় যে বিচারিক ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল, আলকাজার ছিল তার সদর দফতর। মূল ফটক দিয়ে ঢুকলে সেই ট্রাইব্যুনাল কক্ষ এবং গারদ দেখা যায়। এখানে বিচার, অত্যাচার, শাস্তি—সবকিছুরই ব্যবস্থা ছিল। খলিফা হাম্মামের আদলে এটিতেও রয়েছে শীতল জল, গরম জলের কক্ষসহ আরবি হাম্মামখানা।
আলকাজারের ইতিহাস এবং সংরক্ষিত সব নিদর্শন টপকে দক্ষিণ দিকে বের হলে খোলা অঙ্গন এবং শাহি বাগিচা। জালের মতো ছড়ানো পায়ে চলার বাঁধানো পথের মাঝে চেনা অচেনা বৃক্ষ ও গুল্মরাজির স্নিগ্ধ ছায়াঘেরা মাঝ বাগিচা। এখানে বাগান আছে তিনটি—ঊর্ধ্ব বাগান, নিচ বাগিচা এবং মাঝ বাগিচা। এটিতে লেবু, কমলা, সুগন্ধি গুল্মসহ বহু অজানা গাছের সমারোহ। ঘন এবং দীর্ঘ বৃক্ষরাজির কারণে পরিবেশ শীতল এবং ছায়াময়।
সেই ছায়াময় বাগিচা থেকে আরো নিচে নামলে বিশাল খোলা নিচ বাগিচা। সারিবদ্ধ গাছের সারির মাঝে সুইমিং পুল সাইজের একাধিক চৌবাচ্চার মধ্যে ছড় ছড় করে ফোয়ারা উগড়ে দিচ্ছে জল। নির্জন রৌদ্রকরোজ্জ্বল বিকেলে সেই বাগানে আমাদের পরিবারটি ছাড়া আর কোনো দর্শনার্থী নেই, নির্জনতার মাঝে ফোয়ারার শব্দ আরো বহুগুণ বেড়ে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল পাম, সাইপ্রেস গাছে ঘেরা নিচ বাগিচার আনাচে কানাচে। আদিতে এই ফোয়ারা এবং বৃহদাকার চৌবাচ্চার জলের উত্স ছিল গুয়াদালকিভির নদীতে বিশাল চাকার সেচযন্ত্র। আন্দালুসিয়ার ইতিহাসে এই জলকলের নাম ছিল ‘আলবোলাফিয়া’, এটির ছবি প্রাচীন আন্দালুসিয়ার প্রতীক হিসেবে ব্যবহূত হতো চৌদ্দশ শতাব্দী পর্যন্ত। শোনা যায় রানি ইসাবেলা আলকাজারে বসবাস করা শুরু করলে এই জলকলের ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে তাঁর ঘুমের ব্যঘাত ঘটত বলে এটিকে সরিয়ে ফেলা হয়।
ক্যাথলিক সম্রাটরা এই দুর্গে বাস করতেন বলে দুর্গটি বহু ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য সাক্ষী। ভারতের সাথে বাণিজ্যিক সমুদ্রপথের সন্ধানে কলম্বাসের অভিযাত্রার খরচ জোগানোর আবেদন নিয়ে রাজা ফার্ডিনেন্ড এবং রানি ইসাবেলার সাথে সাক্ষাতের কথা আগেই বলা হয়েছে। আলকাজারের নিচ বাগিচায় সেই ইতিহাসকে মূর্ত করে রাখা হয়েছে বিশাল এক ভাস্কর্যকর্ম দিয়ে :এটিতে দেখা যায় পাশাপাশি দাঁড়ানো রাজা-রানির সামনে দাঁড়িয়ে কলম্বাস, তাঁদের কিছু একটা বোঝাচ্ছেন।
আলকাজার থেকে যখন বের হই তখন বেলা আরো পড়ে এসেছে তবে সূর্যের তেজ কিছুমাত্র কমেনি, অথচ ঘড়ির কাঁটা বলছে ট্রেনের সময় হয়ে আসছে। লা জুদেরিয়ার দেয়ালের ধার ঘেঁষে বাইরে নিরাপত্তা পরিখার পাশ দিয়ে আমরা আবার আলমোডোভার গেটের সামনে এসে পৌঁছাই। হালকা তবে দীর্ঘ গাছগাছালির কারণে ফটকের সামনের স্কোয়ারটা বেশ ছায়াময়। শেষবারের মতো আরেকবার প্রাচীন ফটকটা দিয়ে লা জুদেরিয়ায় ঢুকি, ঢোকার মুখে দার্শনিক সেনেকার ভাস্কর্য মূর্তিটা সারাদিন রোদে পুড়ে এখন ছায়ায় জিরিয়ে নিচ্ছে। কাসা আন্দালুসির সামনে গিয়ে ভেতরে ঢুকবো কি না কিছুক্ষণ দোনামোনা করি। আন্দালুসিয়ার প্রাচীন জনপদের জীবনযাত্রাপ্রণালী দেখার জন্য জাদুঘরটির ভেতরে ঢোকার প্রবল ইচ্ছে, আবার এদিকে ট্রেনের সময় হয়ে যাচ্ছে, টিকিট কেটে ঢুকলে প্রাণভরে কিছুই দেখা হবে না, তাই ইচ্ছেকে দমন করে প্রাচীন লা জুদেরিয়ার মায়াময় পরিবেশ ছেড়ে বের হয়ে আসি।
