চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী আর নেই। (ইন্নালিল্লা....রাজেউন)। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে চট্টগ্রামের ম্যাস্ক হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। লাখো জনতাকে কাঁদিয়ে গতকাল শুক্রবার বিকেলে লালদীঘির ময়দানে জানাজা শেষে চশমা হিলে তার প্রিয় বাসভবনের কাছে পারিবারিক কবরস্থানে পিতা-মাতা ও কন্যার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। এর আগে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, মহানগরী পুলিশ প্রশাসন, একাত্তরে তার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া সহযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সালাম ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটায় তিনি ম্যাক্স হাসপাতালে গিয়েছিলেন ডায়ালিসিস করতে। সাড়ে তিনটা নাগাদ হঠাত্ অসুস্থবোধ করেন। তার রক্তচাপ নেমে যেতে থাকে। গঠন করা হয় মেডিকেল বোর্ড। বিকেল চারটার দিকে তাকে দেওয়া হয় লাইফ সাপোর্ট। এরপর আর ফিরেননি চট্টলার এই বীর।
এর আগে গত ১১ নভেম্বর মৃদু স্ট্রোক ও কিডনিজনিত অসুস্থতায় তাকে ম্যাক্স হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছিল। পরদিন তাকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৬ নভেম্বর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সিঙ্গাপুরে। সেখানে তার এনজিওগ্রাম হয়। শরীরে বসানো হয় দুটি রিং। এগারদিন পর ২৬ নভেম্বর ফিরে আসেন ঢাকায়। ১২ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত তিনি ঢাকায় স্কয়ার হাসপাতালে বিশ্রামে ছিলেন। চট্টগ্রামে ফিরে আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন। ফিরলেনও। কিন্তু দুদিন পরেই সবাইকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নিলেন।
লালদীঘিতে জানাজা
মহিউদ্দিন চৌধুরীর নামাজে জানাজা চট্টগ্রামে এ যাবত্কালের মধ্যে সর্ববৃহত্ জানাজায় পরিণত হয়। লালদীঘির ময়দানে অনুষ্ঠিত এ জানাজায় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে অংশ নেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, জাতীয় সংসদ সদস্য এবং স্পিকারের পক্ষ থেকে অংশ নেন আওয়ামী লীগ প্রেসিডেয়াম সদস্য আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, জাতীয় পার্টি নেতা ও পানি সম্পদ মন্ত্রী ব্যারিষ্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাসান মাহমুদ এমপি, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম, প্রয়াত নেতার পুত্র মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, ডা. আফসারুল আমিন চৌধুরী এমপি, এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও মহানগরী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ.জ.ম নাছির উদ্দিন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও নগর আওয়ামী লীগ নেতা আবদুচ ছালাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, কেন্দ্রীয় যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, কেন্দ্রীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ। এছাড়া চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, ডিআইজি চট্টগ্রাম, ডিজিএফআই-এর অধিনায়ক, পুলিশ সুপার, ফায়ার সার্ভিস উপপরিদর্শকসহ প্রশাসনের সর্বস্তরের পদস্থ কর্মকর্তারা এতে উপস্থিত ছিলেন।
নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন মাওলানা আহমেদ জামান। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রয়াত নেতার পুত্র মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল জানাজায় অংশ নেয়া সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান। পরে জনতার বিশাল মিছিল সহকারে মরহুমকে নিয়ে যাওয়া হয় চশমা হিলস্থ পারিবারিক গোরস্থানে। সেখানে তিনি তার পিতা-মাতা ও কন্যার কবরের পাশে অন্তিম শয়ানে শায়িত হন।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিক্রিয়া
নামাজে জানাজা শেষে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিন লালদীঘিতে সমাগত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, চট্টগ্রামে প্রাণপ্রিয় নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে সবাই আজ শোকার্ত। আজ ১৬ ডিসেম্বর তাই বিজয় শোভাযাত্রাসহ অন্যান্য আনন্দ অনুষ্ঠানাদি স্থগিত থাকবে।
এদিকে রাষ্ট্রীয় কাজে কলকাতায় অবস্থান করার কারণে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন টেলিফোনে ইত্তেফাককে বলেন, তার মতো একজন জননেতার শূন্যতা কখনো পূরণ হবে না। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, তার রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজগুলো আমাদের সমাপ্ত করতে হবে। তিনি সবার প্রেরণা হয়ে থাকবেন। ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেন, চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রামের মানুষ একজন যথার্থ অভিভাবককে হারিয়েছে। তার মতো নেতা আর আসবে না। বিশিষ্ট আইনজীবী এডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত বলেন, তিনি সংগ্রাম, একাগ্রতা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে জনগণের রাজনীতি করে প্রমাণ করে গেছেন তিনি চট্টগ্রামের এবং চট্টগ্রাম তার।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক
বিশেষ প্রতিনিধি জানান, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এবং গণমানুষের নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পৃথক শোক বার্তায় তারা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর শোকবার্তায় বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি ভালবাসা ও প্রেমকে লালন করে মহিউদ্দিন চৌধুরী নিজেকে নিজের মাটি থেকে উত্থিত একজন প্রকৃত রাজনৈতিক নেতায় পরিণত করেছিলেন। জনগণের উন্নয়ন ও কল্যাণের জন্য মহিউদ্দিন চৌধুরীর অবদান চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। গণমানুষের হূদয়ে তিনি চিরজীবী হয়ে থাকবেন।’
এদিকে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ প্রমুখ।
জেপি’র শোক
জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক শোক বার্তায় জেপি নেতৃদ্বয় বলেন, এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনি কেবল চট্টগ্রামেরই নন তাঁর প্রভাব ছিল সারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে। তার মৃত্যুতে দেশ একজন দেশপ্রেমিক কর্মবীর ও রাজনৈতিক ব্যক্তিকে হারালো।
ইত্তেফাক/রেজা
