ত্রিশ বত্সর পর ক্ষমতার অস্তাচলে বশির

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৪২

সুদানে ত্রিশ বত্সর ধরিয়া ক্ষমতা আঁকড়াইয়া থাকা প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির গতকাল বৃহস্পতিবার একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা হারাইয়াছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আওয়াদ ইবনে ওউফ সুদানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক ভাষণে এই ঘোষণা দিয়াছেন। এই ঘোষণার পূর্বে কয়েক ঘণ্টা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলা হইতেছিল—শীঘ্রই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসিবে। প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরবিরোধী সংঘর্ষে গত কয়েকদিনে নিহত হইয়াছেন ১১ জন, যাহার মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য রহিয়াছেন ছয়জন। সাধারণভাবে বলা হইতেছে যে, চলতি বত্সর রুটির ওপর ভর্তুকি হ্রাসের সিদ্ধান্ত লইলে সুদানে রুটির মূল্য দ্বিগুণ হইয়া যায়। ইহার প্রতিবাদে দেশব্যাপী ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হইলে বাধ্য হইয়া গত নভেম্বরে আটার ওপর ৪০ শতাংশ ভর্তুকি বৃদ্ধি করে সুদান সরকার। সমপ্রতি সরকারের ভর্তুকির আটা ও জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে পুনরায় বিক্ষোভ শুরু হয়। একপর্যায়ে আতবারা শহরে ক্ষমতাসীন দলের সদর দফতরসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের পর জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। জরুরি অবস্থা উপেক্ষা করিয়াও সেইখানে রাস্তায় নামিয়া আসে বিক্ষোভকারীরা। অতঃপর গতকাল বৃহস্পতিবার নূতন অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন তিন দশকের প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির।

প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির ১৯৮৯ সালে ক্ষমতা দখল করিয়াছিলেন সেনাছাউনি হইতেই একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের ভিতর দিয়া। উত্তর আফ্রিকার বৃহত্ দেশ সুদানের ইতিহাস অবশ্য দ্বন্দ্ব-সংঘাতের। সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিভাজন ও মতবিরোধের ফলে সুদানে আধুনিককালের সবচাইতে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে। ভৌগোলিকভাবে আমরা দেখিতে পাই, সুদানের উত্তরে মিসর, উত্তর-পূর্বে লোহিত সাগর, ইরিত্রিয়া ও ইথিওপিয়া, দক্ষিণ-পূর্বে কেনিয়া ও উগান্ডা, পশ্চিমে চাদ এবং উত্তর-পশ্চিমে লিবিয়া। ২০০৯ সালে দেশটির একটি অংশ ভাগ হয় দক্ষিণ সুদান নামে। দক্ষিণ সুদান আলাদা হইবার পর ২০১৫ সালে সুদানে প্রথম নির্বাচন হয়। বিরোধীদের বক্তব্য, নির্বাচনের নামে প্রহসন হইয়াছিল। বলা হয়, প্রায় সকল ভোটই লুট করিয়াছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির। সমপ্রতি সুদানে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয় গত ১৯ ডিসেম্বর। প্রাথমিকভাবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, মূল্যস্ফীতি ও রুটির মূল্য। এইসময়ে সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির আরো এক মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে থাকিবার জন্য একটি সংশোধনী পাসের উদ্যোগ নেন। গত ফেব্রুয়ারিতে জরুরি অবস্থা জারি করিয়া কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পর্যায়ের সরকারের বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়। সর্বশেষ দলীয় প্রধানের পদ হইতে পদত্যাগ করিবার পরও আন্দোলন প্রশমিত হয় নাই। এইখানে উল্লেখ্য যে, আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সহিত তেমন ভালো সম্পর্ক নাই সুদানের। ১৯৯৩ সালে সুদানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করিয়াছিল যুক্তরাষ্ট্র। অবশ্য ১৯৯৭ সাল হইতে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার কিছুটা প্রত্যাহার শুরু হয় ২০১৭ সালে। তবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ, গোপন জেলখানা, অস্বচ্ছ নির্বাচন—এমন অসংখ্য অভিযোগ রহিয়াছে বশির সরকারের বিরুদ্ধে।

কাহারো ক্ষমতার সূর্য চিরকাল যে মধ্যগগনে থাকে না, গত বৃহস্পতিবার তাহারই আরো একটি করুণ উদাহরণ তৈরি করিল সুদান।