মাত্র তিনদিনের ব্যবধানে বরগুনায় আবারও ক্লাস চলাকালে শ্রেণিকক্ষের ছাদের একাংশ ও বিম ভাঙিয়া পড়িয়াছে। গত বুধবার সকাল নয়টায় ভয়াবহ এই ঘটনাটি যখন ঘটে— তখনও কক্ষটিতে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাস চলিতেছিল। ভবনটির পলেস্তারা খসিয়া পড়িতে দেখিয়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা দ্রুত বাহির হইয়া যাওয়ায় বড় ধরনের একটি দুর্ঘটনা হইতে তাহারা রক্ষা পাইয়াছে। কিন্তু প্রাণে বাঁচিয়া গেলেও ইহার আতঙ্ক ও অভিঘাত যে শিক্ষার্থীদের পিছু ছাড়িবে না তাহা সহজেই অনুমেয়। ইহা কি ভাবা যায় যে, ক্লাসে পাঠরত অবস্থায় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ করিতে হইতেছে ছাদের বিম ধসিয়া সহপাঠীর মর্মান্তিক মৃত্যু। লোমহর্ষক সেই ঘটনাটি ঘটিয়াছিল বরগুনার তালতলী উপজেলার ছোটবগী পিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মাত্র তিনদিনের ব্যবধানে প্রায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিল বরগুনার আমতলী উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া জগত্চাঁদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ইহার পর বরগুনা শুধু নহে, দেশের কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুশিক্ষার্থীর পক্ষে নিরুদ্বিগ্ন চিত্তে পাঠগ্রহণ আদৌ সম্ভব কিনা, তাহা বুঝিবার জন্য মনোবিজ্ঞানী হইবার প্রয়োজন পড়ে না। সম্প্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত অপর এক প্রতিবেদন বলিতেছে— শিক্ষা মন্ত্রণালয়, উপজেলা শিক্ষা অফিস ও আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশে এই ধরনের জরাজীর্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই ভাঙিয়া পড়িবার অপেক্ষায় আছে— এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম নহে। কিন্তু দেখিবার কেহ নাই। যদি থাকিতই—তাহা হইলে বরগুনায় পরপর দুইটি বিদ্যালয়ের বিম ধসিয়া পড়ে কীভাবে?
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এলজিইডির অর্থায়নে সর্বশেষ ধসিয়া পড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নির্মিত হইয়াছিল ২০০১-০২ সালে। ইহার পিছনে ব্যয় করা হইয়াছিল আট লক্ষ টাকা। ইতিপূর্বে তালতলীর ধসিয়া পড়া বিদ্যালয়টির চিত্রও প্রায় অভিন্ন। ভীতিকর তথ্যটি হইল, মাত্র এক বত্সর পরই ২০০২ সালে নির্মিত একতলা বিদ্যালয় ভবনটির বিমে ফাটল দেখা দিয়াছিল। প্রশ্ন হইল, তাহা সত্ত্বেও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিল পাইল কী করিয়া? আর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, উপজেলা শিক্ষা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিই-বা কী করিয়াছেন? ত্রুটিপূর্ণভাবে নির্মিত ভঙ্গুর একটি বিদ্যালয় ভবন কে বুঝিয়া লইয়াছিলেন এবং কেন লইয়াছিলেন তাহারও তদন্ত হওয়া উচিত। নিশ্চিত করা উচিত কঠিন শাস্তি। সর্বোপরি, সারাদেশে শত শত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে—এই তথ্যটিও নূতন নহে। সংবাদপত্রে প্রতিনিয়ত এইসকল খবর প্রকাশিত হইতেছে সবিস্তারে। আমরাও বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করিয়া অব্যাহতভাবে সম্পাদকীয় লিখিতেছি। তাহার পরও কেন আমাদের ভবনের বিম বা ছাদ ধসিয়া আমাদের প্রাণপ্রিয় সন্তানের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর শুনিতে হইতেছে? দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে, শিক্ষাবান্ধব এই সরকার শিক্ষাখাতের উন্নয়নে শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিতেছে। তাহার পরও কেন বিম ধসিয়া পড়িবে? কোমলমতি শিশুরা জীবনের ঝুঁকি লইয়া জরাজীর্ণ ভবনে ক্লাস করিতে বাধ্য হইবে? কোথায় যাইতেছে বরাদ্দকৃত বিপুল পরিমাণ অর্থ? স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই ইহার যথাযথ উত্তর দিতে হইবে। বহন করিতে হইবে এই ধরনের যেকোনো দুর্ঘটনার যাবতীয় দায়-দায়িত্ব।
