‘ইনোভেশন’ বা উদ্ভাবন হচ্ছে প্রচলিত কর্ম বা সেবার প্রক্রিয়াকে আরো উন্নত করা— যা সবার জন্য নতুন সুবিধা বা উপকার তৈরি করে। এমনিতেই ইনোভেশন ধারণাটি বেসরকারি বা ব্যক্তি উদ্যোগের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত। সাধারণভাবে উদ্ভাবন বা ইনোভেশন বলতে আমরা বুঝবো—অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান, সেক্টর বা দেশ থেকে কোনো সৃজনশীল চর্চা নিজ ক্ষেত্রে অনুকরণ করা, সম্পূর্ণ নতুন একটি চর্চার অবতারণা করা, প্রশাসনিক পদ্ধতি অথবা সেবা প্রদানের প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করা। এই ছোটখাট পরিবর্তন ক্রমাগতভাবে বিদ্যমান অবস্থা ও পদ্ধতির ধারাবাহিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। সাধারণত উদ্ভাবনী উদ্যোগের জন্য সৃজনশীলতা প্রয়োজন। বাংলাদেশে এখন টেকসই উন্নয়নের জন্য নানা কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। সরকার সমাজের সর্বস্তরের জনগণকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত রাখতে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। কম সময়ে সমস্ত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নির্ঝঞ্ঝাটে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতার প্রয়োগে নতুন কৌশল উদ্ভাবনের প্রতি বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি পর্যায়ে উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে শক্তিশালী নেতৃত্ব, জনপ্রশাসনে উদ্ভাবনী সংস্কৃতির বিকাশ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, গণকর্মচারীদের দক্ষতা, প্রণোদনা এবং ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা জরুরি বলে ধরা হয়। জনপ্রশাসনে উদ্ভাবনী উদ্যোগ গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাগণকে পৃষ্ঠপোষকতা এবং উত্সাহিত করা প্রয়োজন। এখন দুনিয়াজুড়ে সরকারি পর্যায়ে উদ্ভাবনের লক্ষ্যে নানা প্রচেষ্টা, উদ্যোগ সহজেই চোখে পড়ে। ইনোভেশন বা উদ্ভাবন যাতে ঠুনকো কোনো বিষয় না হয়ে টেকসই হয় সে জন্য সরকারি দফতরে দফতরে পৃথক ইনোভেশন টিম গড়ে তোলার বিষয়টি এখন খুব চোখে পড়ছে। যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিয়ত উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং এর মাধ্যমে জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবাকে মানসম্মত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। উদ্ভাবনে সফলতার নির্ধারিত বিশেষ কোনো ফর্মূলা বা উপায় নেই। তবে এ ক্ষেত্রে সফলতা পেতে হলে যোগ্য ও কার্যকর নেতৃত্ব, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অকুণ্ঠ সমর্থন, সহযোগিতা ও প্রণোদনা লাভের পাশাপাশি উদ্ভাবন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। আমরা আসলে কী চাইছি? আমাদের গন্তব্য কোথায়? কত দূর যেতে চাই এসব ঠিক করে তারপর এগোতে হবে।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতি রেখে প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবন সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। পুরনো ধ্যান ধারণা ত্যাগ করে নতুন মাইন্ডসেট প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। জুনিয়র, অধস্তনদের উদ্ভাবনী উদ্যোগকে বাঁকা চোখে না দেখে এটাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে হবে। তাদের উদ্যোগকে উত্সাহ জোগাতে হবে। সমালোচনা বিতর্ক সৃষ্টি করে অহেতুক জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাবে না। উদ্ভাবনী প্রক্রিয়া সচল রাখতে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা তা আর্থিক হোক কিংবা অন্য যেকোনো ধরনের স্বীকৃতি হোক ব্যবস্থা রাখতে হবে। এই উদ্যোগ সর্বসাধারণের মঙ্গল এবং কল্যাণের উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
বিদ্যমান চর্চায় পরিবর্তন হোক কিংবা অন্য কোনো জায়গা থেকে অনুকরণের মাধ্যমে হোক অথবা সম্পূর্ণ নতুন কোনো চর্চাই হোক, জনপ্রশাসনে উদ্ভাবন এমন একটা বিষয় যা নিজ অধিক্ষেত্রে নতুন বা পরিবর্তিত অবস্থার সৃষ্টি করে এবং এর ফলে নতুনভাবে জনসুবিধা বৃদ্ধি পায়। এটি এমন নতুনত্ব, যা এর আগে অধিক্ষেত্রে প্রয়োগ বা চর্চা হয়নি। আর নতুন চর্চার প্রচেষ্টা স্বাভাবিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রচেষ্টা সফলও হতে পারে, আবার ব্যর্থও হতে পারে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি লাভ করছে। ইতোমধ্যে আমরা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের স্তরে উন্নীত হয়েছি। আমাদের এখানেই থেমে পড়লে চলবে না। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে। সঠিক, যোগ্য, দক্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশকে আরো উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবো, আগামী কয়েক বছরের পথচলায়, তেমন প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যেতে হবে সবাইকে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সোনার বাংলা গড়ার ডাক দিয়েছিলেন। উন্নত আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে আমরা মাথা তুলে দাঁড়াবোই তেমন আস্থা এবং বিশ্বাস ছিল বঙ্গবন্ধুর মনে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেশের মানুষকে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন জাতির পিতা। প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী। দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডে হোক, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উদ্যোগ, কৃষি উত্পাদন যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন উদ্ভাবন বা ইনোভেশনকে উত্সাহিত করতে হবে। উন্নয়নের জন্য বহুমুখী উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টা চলছে। এ জন্য নতুন কৌশল উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই। এটা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। ফলে প্রত্যেককে তার অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, শিক্ষা এবং মেধাকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে হবে। আর এটা কোনো চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। এটা হবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।
n লেখক : ব্যাংকার
