যেখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায় ৭১'র বাংলাদেশ

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৪:৫৮
 
বিজয়ের মাসে মেহেরপুরের ঐতিহাসিক মুজিবনগরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কেন্দ্রে এখন দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। যদিও নির্মাণ কাজটি শেষের পথে তথাপিও সেখানে দাঁড়ালে দেখা যায় ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ।
 
২০০১ সালে একনেকের সভায় মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কেন্দ্র নির্মাণে ৪৫ কোটি ২৫ লাখ ৫২ হাজার টাকার প্রকল্প অনুমোদন পায়। মুক্তিকামী জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল গঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রথম শপথ গ্রহণ, ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনা সমৃদ্ধ তথ্য এবং নিদর্শন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র নির্মাণ। মানচিত্রটিকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
 
এছাড়াও দেখানো হয়েছে যুদ্ধকালীন সময়ে দেশের চারটি পথ দিয়ে শরণার্থী গমন, ঈশ্বরদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ধ্বংস, আ.স.ম আব্দুর রবের পতাকা উত্তোলন, শাজাহান সিরাজের ইশতেহার পাঠ, শালদাহ নদীতে যুদ্ধ, কাদেরিয়া বাহিনীর জাহাজ দখল ও যুদ্ধ, শুভপুর ব্রিজে সম্মুখ যুদ্ধ, কামালপুর ও কুষ্টিয়ার মিরপুরের যুদ্ধ, চালনা ও চট্টগ্রাম বন্দর ধ্বংস, পাহাড়তলী ও রাজশাহীর হত্যাযজ্ঞ, জাতীয় শহীদ মিনার ধ্বংস, সচিবালয়ে আক্রমণ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ, জাতীয় প্রেসক্লাব ধ্বংস, তৎকালীন ইপিয়ার পিলখানা আক্রমণ, রায়েরবাজার বধ্যভূমি ও বুদ্ধিজীবী হত্যার চিত্র, যাদুঘর, স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত গ্রন্থসমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, সেমিনার কক্ষ, মিলনায়তন, স্মৃতিকেন্দ্রের অফিসভবন, গ্রন্থভাণ্ডার ও বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণ, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ৪০টি ভাস্কর্য নির্মাণ, জাতীয় নেতৃবৃন্দের তৈলচিত্র, মিলনায়তন ভবনের গায়ে টাইলসের মুরালচিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের ঋতুকে দৃশ্যমান করে তোলা, ফোয়ারা নির্মাণ, স্বাধীন বাংলার পতাকার প্রতিকৃতি, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল খোদাই করে লিপিবদ্ধ করা, মুজিবনগর সরকারের প্রতীক নির্মাণ এবং টাইলসের ফলকে মুজিবনগর সরকারের প্রচারপত্র নির্মাণ সংযুক্ত করা।
 
মানচিত্রের দক্ষিণপাশ ঘেঁষে রয়েছে এ্যান্টি ফাংগাস টাইলস দিয়ে প্রতীকী বঙ্গোপসাগর। মানচিত্রের বাইরে নির্মাণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চের কালরাত্রি, মুক্তিকামী মানুষের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, পাকবাহিনীর নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠান, ১২ আনসার কর্তৃক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান ও সেক্টর বণ্টন সহ আরোরা-নিয়াজী এবং একে খন্দকারের উপস্থিতিতে পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের ভাস্কর্য।
 
রাজশাহীর বাঘা থেকে আসা দর্শনার্থী আবেদা সুলতানা এবং মহির উদ্দীন জানান, প্রতিবছরই আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঐতিহাসিক মুজিবনগর দেখতে আসি। ইতিহাসের পাতা থেকে যা শিক্ষার্থীদের শেখানো হয়েছে মাত্র একদিনে সেই সকল শিক্ষার্থীরা স্মৃতি কেন্দ্র থেকে তা শিখতে পারবে। নির্মাণ কাজ শেষ হলে পর্যটকরা আরো বিস্তারিত জানতে পারবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এ থেকে জানতে পারবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। একই কথা জানালেন, যশোর থেকে আগত প্রকৌশলী আব্দুর রহমান ও সুলতান কামাল। তারা আরও বলেন, শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধ নয়, সেসময়কার পাকবাহিনী ও আলবদর রাজাকারদের নির্মম নির্যাতন দেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মরা তাদেরকে ঘৃণা করবে।
 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মানচিত্র নির্মাণকারী ঠিকাদারি ঢাকার জেবিবি প্রতিষ্ঠান ২০০৫ সালে পুর্ণাঙ্গারুপে কাজ শুরু করলেও মাঝপথে নকশা কিছুটা পরিবর্তন এবং সংযোজন বিয়োজন করা হয়। তাছাড়া সরকার পরিবর্তনের কারণে নির্মাণ কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ায় এখনও নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবারও কিছু নকশার পরিবর্তন আনা হয়েছে।
 
IMG0
 
মেহেরপুর গণপূর্ত অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সংযোজন বিয়োজনের কারণে সম্পন্ন হয়নি। ২০১১ সালের জুন মাসে নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে আশাবাদ করা হচ্ছে। আরো জানা যায়, মুজিব নগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র স্থাপনে প্রকল্পের মূল্য ছিল ৩০২২ দশমিক ১৩ লাখ টাকা। প্রাপ্ত বরাদ্দ ২৭০৭ লাখ টাকা।  অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। বাংলাদেশের মানচিত্র তৈরির জন্য প্রাপ্ত বরাদ্দ ১৭২৬ দশমিক ০৪ লাখ টাকা। ব্যয় হয়েছে অনুরূপ। ভৌত অগ্রগতি শতকরা ১০০ ভাগ। প্রশাসন ভবন ১৭৩ দশমিক ০৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। অডিটোরিয়াম নির্মাণ ব্যয় হয়েছে ৪১২ দশমিক ১৭ লাখ টাকা। অর্থের অভাবে এখনো অনেক প্রকল্পের কাজ হয়নি। দ্রুত অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন।
 
ইত্তেফাক/জামান