বিক্ষিপ্ত সহিংসতার মধ্য দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে ভারতের জাতীয় নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ। প্রথম ধাপে ১৮ রাজ্য ও কয়েকটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৯১টি আসনে ভোট হয়েছে। ভারতের সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভার সাত ধাপের এই ভোট চলবে ১৯ মে পর্যন্ত। আগামী ২৩ মে ভোট গণনা হবে। দিল্লির ক্ষমতায় কে বসছেন ওই দিনই তা জানা যাবে। প্রথম ধাপের নির্বাচনে সহিংসতায় দুই জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) যন্ত্রে ত্রুটি দেখা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভোটার তালিকায় অনেক ভোটার নাম খুঁজে পাননি বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এবারের নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি’র গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের নির্বাচন হিসেবে। ভোটের দিনই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশজুড়ে আবারো ‘মোদি জোয়ার’ আসছে। তবে কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি অপরাজেয় নন। ২০০৪ সালে বিজেপির পরাজয়ের কথা ভুলে যাবেন না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, বিজেপি পাঁচ বছরে কিছুই করেনি। কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের চাকরি খেয়েছে। এদিকে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর প্রাণনাশের চেষ্টা হচ্ছে বলে নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ করেছে দলটি। তারা বলেছে, বুধবার আমেথিতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর গণমাধ্যমের সঙ্গে রাহুল গান্ধী যখন কথা বলছিলেন, তখন তার মাথায় লেজার আলো দেখা গেছে। এই আলো কোনো স্নাইপার রাইফেলের হতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ দাবি নাকচ করে বলেছে এটি মোবাইলে ছবি তোলার আলো হতে পারে।
ভারতে লোকসভার মোট আসন ৫৪৩। সরকার গঠন করতে কোনো দল বা জোটের ২৭২টি আসন দরকার। ২০১৪ সালের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি’র হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করেছিল। বিজেপি টানা দ্বিতীয়বারের মত নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রচারণা চালাচ্ছে। তবে এবার তাদের কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়তে হবে। কারণ কিছু আঞ্চলিক দল আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং গতবারের চেয়ে ভালো অবস্থানে উঠে এসেছে বিরোধী দল কংগ্রেস। ৯১ আসনে গতকাল প্রথম ধাপের নির্বাচনে ভোটার ছিল ১৪ কোটি ২১ লাখ। মোট ভোট কেন্দ্র ছিল প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার। ৯১ আসনে ১ হাজার ২৭৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ দফায় হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নীতিন গড়কড়ি (নাগপুর), কিরেন রিজিজু (অরুণাচল পশ্চিম), জেনারেল ভি. কে. সিং (গাজিয়াবাদ) প্রমুখ।
লোকসভার ভোটের সাথেই অন্ধ্র প্রদেশ, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ এবং ওড়িশা রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনও চলছে। এদিন সকাল সাতটা থেকে শুরু হয়ে ভোট চলে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। যদিও নকশাল অধ্যুষিত এলাকা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে নিরাপত্তার কারণে কোথাও সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা, সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৪টা, আবার কোথাও ৭টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ভোট নেওয়া হয়। ভোট হয়েছে ইভিএমে। ভোটার তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোটটি দিয়েছেন কিনা তা জানতে ইভিএম’র সাথেই যুক্ত ছিলো ভিভিপ্যাট ব্যবস্থা। ভোট অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু করতে দেশজুড়ে ভোট কেন্দ্রগুলোতে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়। এছাড়াও স্পর্শকাতর কেন্দ্রে অতিরিক্ত নজরদারি হিসেবে সিসিটিভি ক্যামেরা, ড্রোন, টহল পুলিশ ভ্যানসহ সব ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফায় কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার আসনে ভোট হয়েছে।
প্রথম দফার ভোটে বিক্ষিপ্ত সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। অন্ধ্র প্রদেশের সাত্তেনাপল্লীতে টিডিপি এবং ওয়াইএসআর কংগ্রেস দলের সংঘর্ষে দুই জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া তরিপারি আসনে সংঘর্ষ, উত্তর প্রদেশের কৈরানায় গুলির ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গের দিনহাটায় বুথ ভাঙচুর, কোচবিহারে বাম প্রার্থীর গাড়িতে হামলার অভিযোগ উঠেছে। মহারাষ্ট্রের গড়চিরওলিতে আইইডি বোমার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। অন্ধ্র প্রদেশের প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাজ্যের বিভিন্ন আসনে ৩৬৩২ ইভিএমে ত্রুটি দেখা দিয়েছে। উত্তর প্রদেশের আসনগুলোতে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। পর্যবেক্ষকদের অনেকে এই নির্বাচনকে কয়েক দশকের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। প্রথম ধাপের নির্বাচনের পর দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন হবে আগামী ১৮ এপ্রিল। এদিন ৯৭টি আসনের ভোটযুদ্ধে নামবেন প্রতিদ্বন্দ্বীরা। দিন যত যাচ্ছে, নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন দলের নেতাদের কথার যুদ্ধ ও তিক্ততা বাড়ছে।
দেশজুড়ে মোদি জোয়ার বইছে :নরেন্দ্র মোদি
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, প্রথম দফার নির্বাচনের প্রবণতা দেখে বোঝা যাচ্ছে দেশজুড়ে আবারো এক বিশাল মোদি জোয়ার আসতে চলেছে। আসামের শিলচরে গতকাল এক জনসভায় মোদি বলেন, জোয়ার কোনদিকে বইছে চোখ-কান খোলা রাখলে আপনারাই বুঝতে পারবেন। তিনি বলেন, আসামে যে পাঁচটি আসনে ভোট হয়েছে তার সব কয়টিতেই জিতবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট।
মানুষের থেকে বড় কেউই নন : রাহুল
রাহুল গান্ধী বলেছেন, ভারতের রাজনীতিতে অনেকেই নিজেদের অপরাজেয় মনে করেছেন। তাদের মনে হয়েছে, তারা দেশের মানুষের চেয়েও উচ্চতায় চলে গেছেন। কিন্তু পরে সবাই বুঝেছেন, মানুষের থেকে বড় কেউই নন।
ভারতের স্বাধীনতা সংকটে :মমতা
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি গতকাল দার্জিলিংয়ে এক জনসভায় বলেছেন, কে থাকবে, কে যাবে, সেটা বিজেপি ঠিক করে দিতে চাইছে। নাগরিক তালিকা- এনআরসি করে সবাইকে তাড়িয়ে দিতে চাইছে। বিজেপির কারণে ভারতের সংবিধান, স্বাধীনতা সংকটের মুখে পড়েছে।
