লোক বাড়লেও বাড়েনি ঘর

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৬:০০
 
নির্মাণের ১৭ বছর পরও সংস্কার না হওয়ায় সামনের দিনগুলো কিভাবে কাটবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে মেহেরপুর সদর উপজেলার তেরঘোরিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের। সময়ের দীর্ঘসূত্রিতায় সংসারে লোকজন বাড়লেও বাড়েনি তাদের থাকার ঘর। আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৬শ' লোকের বসবাসের এলাকায় নেই কোন সরকারি কবরস্থান। এছাড়া সেখানে রয়েছে আর্সেনিকমুক্ত পানির অভাব। সংস্কার করা প্রয়োজন বাথরুম ও চলাচলের রাস্তা। সরকারি নজরদারী না থাকায় নানা সমস্যা নিয়ে দিন কাটছে তেরঘোরিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের।
 
মেহেরপুর শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি তেরঘোরিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পটি। ছিন্নমূল মানুষের আশ্রয় করে দিতে ১৯৯৯ সালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন আমনে ৫৫ ব্যাটালিয়নের মেজর ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বে প্রকল্পটি গড়ে তোলা হয়। প্রকল্পের ১০টি ব্যারাকে ১০টি করে মোট একশ'টি পরিবার রয়েছে। পরিবার গুলোর মধ্যে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের ২৭টি পরিবারও আশ্রয় নেন। যাদের মধ্যে জীবিত আছেন ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা।
 
সরেজমিনে- তেরঘোরিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে এ সবের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এসবের অধিকাংশ নষ্ট হয়ে গেছে দেখা যায়। সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে জড় হন আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা জেহের আলী, খোদা বক্স, আব্দুল মান্নান, নায়েব আলী, দাউদ হোসেন, জমসের আলী, মূলুক চাঁদ, আব্দুল জব্বার, ইসমাইল হোসেন, শের আলী, আব্দুল মতিন, আব্দুল ওয়াদুদ, দাউদ আলী, মহিরউদ্দিন ও আজাহার আলীসহ অনেকে। তারা জানানেল নানা সমস্যার কথা। সুপেয় পানি সমস্যার কথায় তারা বললেন, ২০০২ সালে তাদের জন্য ৪টি আর্সেনিকমুক্ত টিউবওয়েল স্থাপন করে দেয়া হলেও তার মধ্যে ৩ টি নষ্ট হয়ে গেছে। মেরামত করার কোন উদ্যোগ নেই। আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাছে একটি বে-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে (বর্তমানে সরকারি)। সেখানে ৪ জন শিক্ষক ও ১৮৫ জন শিক্ষার্থীর রয়েছে। এ স্কুলের শিক্ষকরা শিক্ষার আলো জ্বেলে গেলেও সরকারিভাবে সকল সুবিধা এখনো হয়নি।
 
১৭ বছর আগের তৈরি টিনের ঘেরা ও ছাউনি ব্যারাকে মরিচা ধরেছে। টিনের নাট-বোল্ট নষ্ট হয়ে গেছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের রাস্তা কাঁচা হওয়ায় যাতায়াতের অসুবিধাও রয়েছে তাদের। পুকুর দু'টি দীর্ঘ দিনেও সংস্কার না হওয়ায় ময়লা মাটিতে ভরে গেছে। সরকারি সহযোগিতায় পাওয়া ১০ হাজার টাকার ব্যাংক ঋণে এখন আর কোন কাজ হচ্ছেনা। ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি না করা হলে উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে জানালেন তারা। তারা পালি কলে গ্রাম পাহারা করে থাকেন। পাহারা বন্ধ করলে আশ্রয়ণ প্রকল্পে চুরি-ডাকাতি হয়। ইতোপূর্বে এক-দু’দিন পরপর পুলিশ আসলেও এখন আর আসেনা এমন অভিযোগও করলেন তারা।
 
আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশের বিজন বিলের উপর একটি ব্রিজ হলে আপাদে-বিপদে দ্রুত তেরঘোরিয়া গ্রামবাসীর সহযোগিতা তারা পেতেন এমন দাবি তাদের। এছাড়াও তাদের দাবি ঘর সংস্কার, প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ ও পুকুর ২টি পুনঃখনন, স্থায়ী কবরস্থান, রাস্তা ও বাথরুম সংস্কার এবং নিরাপদ পানির। শুধু এটাই শেষ নয়। আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা ষাটোর্ধ মর্জিনা জানালেন, এক যুগেরও বেশি সময় আগের পাওয়া ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের ও ৯ ফুট প্রস্থের একটি কক্ষে বর্তমানে ৩ ছেলে ও এক নাতি নিয়ে কিভাবে বাস করা সম্ভব। ছেলেদের বিয়ে হয়েছে। ঘরে বউ এসেছে। এখন কষ্ট অনেক বেড়ে গেছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের এমন অনেকের দাবি গত ১৭ বছরে সন্তান বেড়েছে; তারা বড় হয়েছে। কিন্তু কোন ঘর বাড়েনি।
 
মেহেরপুর সদর উপজেলা নির্বাহী মিজানুর রহমান জানান, তেরঘোরিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের সমস্যা আছে। তবে রঘুনাথপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের মত নয়। নানা সমস্যার কারণে রঘুনাথপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের অনেক পরিবার আশ্রয়ণ প্রকল্প ছেড়ে গেলেও তেরঘোরিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের সে ধরণের সমস্যা নাই। যে কারণে তাদের সকল পরিবারই বর্তমান আছেন। তার পরও তাদের সমস্যাগুলো সরকারিভাবে সমাধান হবে।
 
ইত্তেফাক/জামান