ফাইভ-জি’র কাছে ফোর-জি যেন মান্ধাতার যুগ

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৮, ২২:০৪

জিঠিকই শুনেছেন। ফাইভ-জি’র কাছে ফোর-জি একঅর্থে মান্ধাতার আমল। ‘জি’ মানে জেনারেশন। টু-জি, থ্রি-জি ও ফোর-জি অর্থাত্ দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক ছাপিয়ে বিশ্ব এখন ছুটছে ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের দিকে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৫-জি চালু হয়ে গেছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীন এবং ইউরোপের বেশ কিছু দেশেও কিছুদিনের মধ্যে ৫-জি সার্ভিস চালু হয়ে যাবে।

এ বছর ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশে চালু হয়েছে ৪-জি নেটওয়ার্ক। ৪জি’র আগে ৩-জি-তে ইন্টারনেটের যে গতি ছিল, তাতে কোনো ভিডিওর লাইভ স্ট্রিমিং বা ফেসবুক লাইভ করতে গেলে বাফারিংয়েই সময় চলে যেত। এখানেই লুকিয়ে ৫-জি’র কার্যকারিতা, প্রয়োজনীয়তাও। এটা বুঝতে আমরা ছোটবেলায় করা পাটিগণিতের নল-চৌবাচ্চার অঙ্কটা মনে করতে পারি। তিনটে সরু নলের থেকে তুলনায় দুটো মোটা নলে পানি পড়লে চৌবাচ্চা তাড়াতাড়ি ভরবে। টেলিকম ক্ষেত্রে ওই সুরু থেকে মোটা নলের মাপই হল ১-জি, ২-জি, ৩-জি, ৪-জি, ৫-জি এইভাবে। খেয়াল করে দেখবেন, হ্যান্ডসেটের টাওয়ার সিগন্যালের কাছে ছোট হরফে লেখা থাকে, G, E, 3G, 4G প্রভৃতি অক্ষর। G-এর অর্থ জেনেরাল প্যাকেট রেডিও সার্ভিস বা জিপিআরএস। এই G-কেই দ্বিতীয় প্রজন্মের মোবাইল প্রযুক্তি ২-জি বলা হয়। এই প্রযুক্তির মোবাইল ইন্টারনেট সার্ভিস অত্যন্ত ধীরগতির এবং ২-জিতে ফোন করা, টেক্সট মেসেজ পাঠানো ভালোভাবে করা যায়। E অক্ষরের অর্থ EDGE বা এনহান্সড ডেটা রেটস ফর জিএসএম এভোলিউশন। এই প্রযুক্তি ২-জি ও ৩-জি এর মাঝামাঝি। ৩-জি’র অর্থ UTMS বা ইউনিভার্সাল মোবাইল টেলিকম সিস্টেম। ৩-জি প্রযুক্তিতে ব্রডব্যান্ড পরিষেবা পাওয়া যায়। ইন্টারনেটের গতি একটু বেশি। ফলে ভিডিও দেখা, গান শোনা, ছবি দেখা চলে সহজেই। আরও দ্রুতগতির ইন্টারনেট স্পিড এবং সেই সঙ্গে হাইডেফিনিশন ভয়েস ও ভিডিও দেখা সম্ভব ৪-জি প্রযুক্তিতে। গেমিং, পুরো একটা গোটা সিনেমা দেখা—সবই করা যায় কোনো বাফারিং ছাড়াই।

আর ৫-জি? এটা আরও উন্নত প্রযুক্তি। চোখের নিমেষে গোটা একটা সিনেমা ডাউনলোড করে ফেলা যাবে। ৪-জি’র তুলনায় ৫-জিতে অন্তত ৫০-৬০ গুণ বেশি গতিতে চলে ইন্টারনেট। ওই প্রযুক্তি দিয়ে এমন অনেক কিছু করা যাবে যা এখনও কল্পনা করা যায় না। পৃথিবীর অন্য গোলার্ধে বসে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত রোবট দিয়ে অনায়াসে অস্ত্রোপচার সেরে ফেলতে পারবেন কোনো স্মার্ট হাসপাতালে। উন্মোচিত হবে টেলিমেডিসিনের এমনই আরও অনেক সম্ভাবনা। অথবা, আপনি হয়ত কাজের সূত্রে অন্য শহরে। সকালে বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যেতে ড্রাইভার না এলে সমস্যা হবে না। দূরে বসে থেকেও ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি হেডসেট মাথায় গলিয়ে রিমোট কন্ট্রোলে চালাতে পারবেন সেলফ ড্রাইভেন কার।

যে গতি এবং প্রযুক্তি নিয়ে আজ ৪জি চলে, আগামী দিনে যখন অগমেন্টেড অ্যাসেম্বলি ইনস্ট্রাকশন (স্মার্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, ই-এডুকেশন, ই-মেডিক্যাল ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশান ইত্যাদি) আরও বহুল ভাবে ব্যবহূত হতে শুরু করবে, তখন তা সামাল দিতে পারবে না ৪-জি। ওই পরিমাণ ডেটা একসঙ্গে সামাল দেওয়ার ক্ষমতাই ৪-জি ব্যান্ডউইডথের নেই। ৫-জি-এর মাধ্যমে অগমেন্টেড এবং ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির ওপর ভিত্তি করে করা হলোগ্রাফিক কমিউনিকেশন চালু করতে পারবে, যা রিমোট কন্ট্রোলড লার্নিং অ্যান্ড ট্রেনিং, গেমিং-সহ একাধিক ক্ষেত্রে বিশাল বাজার খুলে দেবে।

ফাইভ-জি-তে রয়েছে বিপুল ডেটা ট্রান্সফারের ক্ষমতা। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, অগমেন্টেড রিয়্যালিটি, ইন্টারনেট-অফ-থিংস এর মতো ভবিষ্যত্ প্রযুক্তি ও সেবা বর্তমানের তুলনায় দশ হাজার গুণ দ্রুত গতিতে চলবে। হ্যাঁ। সংখ্যাটা ঠিকই পড়েছেন—দশ হাজার গুণ। ৫-জি-তে বাফারিং নেমে আসবে ১ মিলিসেকেন্ড, যা চোখের পলক ফেলার সময়ের ৪০০ ভাগের ১ ভাগ মাত্র। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলে ৩-জি, ৪-জি ও ৫-জি নেটওয়ার্কের গতির ক্ষমতা বোঝা যাবে। ধরুন আপনি ভালোমানের দু’ঘণ্টার একটি সিনেমা ডাউনলোড করতে চান। ৩-জি নেটওয়ার্কে ওই ধরনের একটি সিনেমা ডাউনলোড করতে সময় লাগবে প্রায় ২৫ ঘণ্টা। স্ট্যান্ডার্ড ৪-জি নেটওয়ার্কে লাগবে কমপক্ষে ৬ মিনিট। আর ৫-জি তে লাগবে মাত্র সাড়ে তিন সেকেন্ড। অর্থাত্ ৩-জি-তে ছবি ডাউনলোড করতে দিয়ে আপনি ওই সময়ের ভেতরে বিমানে করে নিউইয়র্ক থেকে সিডনি চলে যেতে পারবেন। ৪-জি-তে এক কিলোমিটার দৌড়ে আসতে পারবেন। আর ৫-জি ডাউনলোড হয়েছে কিনা—প্রশ্নটা শেষ করার আগেই ডাউনলোড হয়ে যাবে।  

সত্যিকার অর্থে পৃথিবীর ভবিষ্যত্ দাঁড়িয়ে থাকবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিক্স, ব্লকচেইন টেকনোলজি, ইন্টারনেট অফ থিংস, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি এবং অগমেন্টেড রিয়্যালিটির ওপর। এইসব ক্ষেত্রে আগামী দিনে একটি দেশ যত উন্নতি করতে পারবে, তারা তত বেশি উন্নত দেশ হবে। আর এটার দারুণ এক হাতিয়ার ৫-জি। ৪-জি-তে আমরা ঢুকেছি অনেক দেরি করে, ৫-জি’র জন্য এখনই প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।

n লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিক