মানবজীবনে বই পড়ার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত’। আর সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হলে মানুষকে বই পড়তে হবে। একমাত্র বই পড়ার মাধ্যমেই মানুষ তার জ্ঞানের পরিধিকে বিস্তৃত করতে পারে। কারণ প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হয় বই পড়ার মাধ্যমে। বই পড়ার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞান আহরণের পাশাপাশি তার চিন্তাশক্তি, যুক্তিবুদ্ধির জাগরণ ঘটে, যা একজন স্বশিক্ষিত মানুষের জন্য অপরিহার্য। বই পড়ার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞানের রাজ্যের সঙ্গে পরিচিত হয়। শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ হলো সাহিত্যচর্চা। আর সাহিত্যচর্চা করতে হয় বই পড়ে। বই পড়া ছাড়া উপায় নেই। মানুষ আনন্দ সন্ধানী কিন্তু জাগতিক জীবনকে বস্তুগত ভোগ কিছুতেই আনন্দ দিতে পারে না। বই-ই পারে সে আনন্দকে বাড়িয়ে তুলতে।
বস্তুত বই আনন্দের আঁধার, অমৃতের সুধাভাণ্ডার। পৃথিবীর বিখ্যাত দার্শনিক ও সাহিত্যিক টলস্টয়কে জীবনের প্রয়োজনীয় বস্তু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন যে, জীবনে তিনটি বস্তু প্রয়োজন আর তা হলো বই, বই আর বই। আর বই পড়ার একমাত্র উদ্দেশ্য শুধু জ্ঞানী হওয়াই নয়, এটি মানুষের অন্তরদৃষ্টিকে প্রসারিত করে, মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে। সেই প্রাচীনকাল থেকে আনন্দ-অনুজাগরূপ মানুষের পাশে রয়েছে বই। জীবনের সব উপকরণ হারিয়ে যায়, ফুরিয়ে যায় কিন্তু বই রয়ে গেছে চিরনতুন, চিরযৌবনরূপে। কবি, দার্শনিক ওমর খৈয়াম মানবজীবনে বইয়ের স্থানকে নির্ধারণ করে বলেছেন, ‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্তযৌবন- যদি তেমন বই হয়।’
দার্শনিক ও নাট্যকার বারট্রান্ড রাসেল জীবনের রূঢ় বাস্তবতা ও জটিলতা থেকে আমাদের মুক্তি পেতে বইয়ের মাঝে ডুব দিতে পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মানুষ বই দিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে সাঁকো বেঁধে দিয়েছে।’
একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সঙ্গে শত্রুতা করে, কিন্তু বই কখনো কারো সঙ্গে শত্রুতা করে না। বই পড়া মানেই মহামনীষীদের সম্পর্কে জানা, তাদের সান্নিধ্য লাভ করা। যে জাতির জ্ঞানের ভাণ্ডার শূন্য, তার ধনের ভাণ্ডারও শূন্য। তাই জ্ঞান অর্জন আর ধন অর্জন করার জন্য বই পড়া একান্ত প্রয়োজন। বইয়ের সঙ্গে মানুষের নিত্য কথা হয়। আর নিত্য কথা থেকেই জন্ম নেয় এক অনাস্বাদিতপুণ্য আনন্দের। বই তাই মানুষের অবসাদক্লিষ্ট মুহূর্তকে ভুলিয়ে দিতে পারে আনন্দের অমিয় ধারায় প্লাবিত করে দিয়ে। সারা বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হতে হলে স্রষ্টার সৃষ্টিশীল সম্পর্কে জানতে হলে বই পড়তে হবে।
পৃথিবীতে রয়েছে হাজারো রকমের বিচিত্র বই। একেক ধরনের বই মানুষকে একেক রকম জ্ঞানদান করে, তথ্যদান করে। কিছু কিছু বই মানুষকে আনন্দ দান করে, হাসায়। মানুষ তার রুচি অনুযায়ী বই নির্বাচন করে থাকেন। কিন্তু বই নির্বাচনের মধ্যেও সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি, কারণ এমন বইও রয়েছে যা মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এসব বই পাঠ করে মানুষ ক্ষণিকের জন্য আনন্দ পায় ঠিকই কিন্তু তা সার্বিক বিচারে দেশ ও জাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। তাই আমাদের উচিত সুপাঠ্য ও নীতিমূলক বই পড়া। মনে রাখতে হবে বই যুগ যুগ ধরে আমাদের সভ্যতাকে ধারণ ও লালন করে আসছে। আমাদের পড়া উচিত সেসমস্ত বই, যেসব বই ব্যক্তির মনে খোড়াক যোগায়, মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়। সেসব বই পড়া অপরিহার্য। বই মানুষের নিঃস্বার্থ বন্ধু। বই পড়ার জন্য লাইব্রেরির গুরুত্ব অনেক। তাই বই পড়ার জন্য লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। জীবনে বড় হতে হলে ভালো কিছু মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়, ভালো কিছুর সংস্পর্শে থাকতে হয়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভালো কিছু বই সংগ্রহ করে পড়া।
n লেখক: শিক্ষার্থী, কড়ৈতলী উচ্চ বিদ্যালয়,
ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর
