দুরবস্থায় পুরাতন লোহা ব্যবসায়ীরা

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৮, ২৩:৫০

মরচে পড়া পুরাতন লোহার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় একটি বিমর্ষ মুখ। তার চোখে নেই আশা কিংবা উজ্জ্বলতার রশ্মি। রাজ্যের চিন্তা মাথায় নিয়ে মুখে হাত দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে আছেন ভাবলেশহীন চোখে। রাজধানী ঢাকার এক পুরাতন লোহা ব্যবসায়ীকে এমনই দেখাচ্ছিল গত বুধবার দুপুরে। কথা বলতে গেলে তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খুব খারাপ। এখন এমন অবস্থা মাঝে মাঝেই হচ্ছে। টানা ১৫-২০ দিন কোনো ক্রয়-বিক্রয় হয় না। দোকানের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে আজকাল।

খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, বেশিরভাগ দোকানের প্রায় একই অবস্থা। এ অবস্থার কারণে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে ব্যবসা ছেড়ে অন্য ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। অন্যান্য সমস্যা ছাড়াও সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থাকে দায়ী করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

পুরান ঢাকার বাবুবাজার ব্রিজের পাশে বাগডাসা লেনের দু’দিকে গড়ে ওঠা পুরাতন লোহার মার্কেটের ব্যবসা চলছে এমনভাবে। সাপ্তাহিক বন্ধ শুক্রবারের বাইরে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এসব দোকানগুলোতে বেচাকেনা চলতে থাকে। বিভিন্ন মাপের দরজা, জানালা, গেট, শাটার গেট, বিল্ডিং কন্সট্রাকশানের প্রপস, স্ক্রাপ-ফোল্ডিং ও পাইপসহ নানা রকম সাজ সরঞ্জাম, প্লেইন শিটসহ লোহার তৈরি নানা ছোট-খাটো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যায় এখানে। পুরাতন বা ব্যবহূত এসব জিনিস অপেক্ষাকৃত কম দামে কিনতে পাওয়া যায়। এখানে সাধারণত কেজি দরে লোহার তৈরি জিনিস বিক্রয় করা হয়। মার্কেটের ভেতরেই গড়ে উঠেছে ওয়েল্ডিং দোকান যেখান থেকে প্রয়োজনীয় মাপ মত জিনিস প্রস্তুত করাও সম্ভব।

প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা এ ব্যবসার অবস্থা এখন বেশ নাজুক বলে মন্তব্য করছেন ব্যবসায়ীরা। এমন পরিস্থিতির কারণ সম্পর্কে তারা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কেটের পাশেই মহানগর হাসপাতালের সীমানা প্রাচীরের চারপাশ জুড়ে গড়ে ওঠা ভাসমান ‘পুরাতন লোহার’ দোকানগুলোকে দায়ী করছেন অনেকে।

স্থানীয় অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায়, পুলিশ চাঁদা নিয়ে এসব ভাসমান দোকান গড়ে উঠতে দিয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ফুটপাত থেকে পুরাতন লোহার দোকান প্রতি ১৫০ টাকা চাঁদা নেয় পুলিশ।

এ ব্যাপারে বংশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিদুর রহমান বলেন, এমন ঘটনার বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে যত দ্রুত সম্ভব তিনি নিজে উপস্থিত হয়ে খোঁজ নেবেন এবং এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মোশারফ হোসেন নামে একজন ব্যবসায়ী বলছিলেন, তিনি এখানে দু’যুগের বেশি সময় ধরে ব্যবসা করছেন। আগে শুধু লোহার পুরাতন জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয় করতেন। তবে এখন ব্যবসার অবস্থা খারাপ হবার কারণে নতুন জিনিসও বিক্রয় করেন।

সরেজমিন দেখা যায়, মহানগর হাসপাতালের চারিদিকের সীমানা প্রাচীর ঘিরে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক ভাসমান দোকান। যা এখন প্রায় স্থায়ী আকার ধারণ করেছে। ফুটপাতে গড়ে ওঠা দোকানের জিনিসপত্র বাইরে বের হয়ে আছে অনেকাংশে। রাস্তার বেশিরভাগ অংশ দখল করে চলছে মেরামত ও বিক্রয় সংক্রান্ত নানা কাজকর্ম। ফলে সংকীর্ণ গলিপথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ পথচারী, রিকশা ও ছোট যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়ে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। ফুটপাতে গড়ে ওঠা এসব দোকানের নানা রকম শব্দ হাসপাতালে রোগীদের জন্য বেশ সমস্যা সৃষ্টি করছে। পাশের দুটি স্কুল আহমেদ বাওয়ানী একাডেমী ও হাম্মাদীয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চলাচলে নানা রকম সমস্যা হচ্ছে এসব দোকানের জন্য। এ ব্যাপারে ৩২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. বিল্লাল শাহ বলেন, আগে ফুটপাতে খুব বেশি দোকান ছিল না। তবে ইদানিং স্থানীয় অনেকেই নতুন করে দোকান বসিয়ে ব্যবসা করছে। তার কাছেও এমন অভিযোগ এসেছে। নিজে সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে অবস্থা দেখে দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন।

ঢাকা মহানগর হাসপাতালের পরিচালক ডা. আজমল হোসাইন বলেন, কর্তৃপক্ষ বরাবর অভিযোগ দিয়ে বেশ কয়েকবার ফুটপাত থেকে এসব দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে তাতে স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। উচ্ছেদ করার দু’একদিন পরই আবার আগের মত দোকান বসে গিয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু