চাই নতুন আশা ও সাহস

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৫২

আবুল কাসেম ফজলুল হক

মানুষের সত্তায় দ্বৈধ আছে—ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় ও কর্তব্য-অকর্তব্যের বোধ আছে। যা করা উচিত নয়, তার প্রতিও মানুষের মন ধাবিত হয়—অত্যন্ত প্রবলভাবেও ধাবিত হয়। দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতি, ধর্ষণ ও আনুষঙ্গিক নিষ্ঠুরতা, জুলুম-জবরদস্তি, খুন-খারাবি, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে মানুষের অনুচিত-প্রবণতার প্রকাশ ঘটে। আবার শুভ, ন্যায় ও কল্যাণের প্রতি মানুষের আগ্রহের, মহান কিছু অর্জনের জন্য ত্যাগ স্বীকারের নীতি ও আদর্শের সন্ধানে দৃঢ় চিত্ততার, সাধনার ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মানবতার মহত্ত্বের দিকও প্রকটিত হয়। যাঁরা মানুষের সত্তায় কেবল খারাপ দেখেন, মানুষকে শিয়াল, শকুন, কুকুর, গণ্ডার, বাঘ, সিংহ ইত্যাদির মতো বলে মনে করেন, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিবেচনা ভুল। মানুষকে কেবল ভালো মনে করে যাঁরা মানুষের সঙ্গে চলতে চেষ্টা করেন তাঁরাও ভুল করেন এবং পদে পদে বিড়ম্বিত হন। মানুষের প্রকৃতি অত্যন্ত জটিল—তাতে ভালো ও মন্দ দুইই আছে। মানুষ কত কিছু সৃষ্টি করেছে—ধ্বংসও করেছে। মানুষের সৃষ্টিতে আছে জাতি রাষ্ট্র, দর্শন-বিজ্ঞান-ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য, উত্পাদন, সৃষ্টি। মানুষ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে সত্যমুখী করতে হবে—ভুল ধারণা পরিহার করতে হবে। মহান সব কাজের দিকে আমাদের ধাবিত হতে হবে।

একজন কবির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি উক্তি মনে পড়ছে :

যাঁদের কথায় জগত্ আলো

            বোবা আজকে তারা,

মুখে তুবড়ি ফোটে তাদের

            আকাট মূর্খ যারা।

সমাজে যাঁরা এখন কর্তৃত্ব করছেন, তাঁদের মন-মানসিকতা, চিন্তা-ভাবনা ও কার্যক্রমকে বুঝতে হবে। কোন গন্তব্যের দিকে তাঁরা আমাদের নিয়ে চলছেন? কোন পথে আমাদের চলতে হবে? সাধনা ও সংগ্রামে উদ্যোগী ও অগ্রসর হতে হবে।

ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, স্ত্রী হত্যা, স্বামী হত্যা, শিশু হত্যা, অসামাজিক কার্যকলাপ ইত্যাদি কি অনেক বেড়ে চলছে না? এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, আকস্মিক ঘটনা, গুরুত্বহীন ব্যাপার বলে মেনে নিয়ে চলা কি ঠিক? আমাদের জাতি তো একটা জনগোষ্ঠীগত-অবক্ষয়ের মধ্যে পড়ে গেছে। সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের সীমা অতিক্রম করে যখন জাতীয় জীবনে অবক্ষয়ের ধারা চলতে থাকে  তখন দেখা দেয় জনগোষ্ঠীগত অবক্ষয়—বংশগত অবক্ষয়। কেবল শাস্তি দিয়ে  সমস্যার সমাধানের কথা বলছেন সবাই। আমার মনে হয়, ব্যাপারটি কেবল কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তি দিয়ে সমাধানের পর্যায়ে নেই। এ নিয়ে গভীরতর অনুসন্ধান দরকার। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক দিক দিয়েও দেখতে হবে এবং সমাধান খুঁজতে হবে।

সংস্কৃতির ধারণাকে নানাভাবে বিস্তৃত করে ফেলা হয়েছে। বিশিষ্টজনেরা কেবল অপসংস্কৃতিকেই বলছেন সংস্কৃতি। যেমন—বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ধর্ষণের সংস্কৃতি, দুর্নীতির সংস্কৃতি, নারীনির্যাতনের সংস্কৃতি, মিথ্যাচারের সংস্কৃতি, প্রশ্ন আউট করার সংস্কৃতি, মৌলবাদের সংস্কৃতি, ইত্যাদি কথা তাঁরা প্রতিনিয়ত বলছেন। ক্রমাগত  অপসংস্কৃতিকে তাঁরা বলছেন সংস্কৃতি। আসলে এই বিশিষ্টজনেরা  অপসংস্কৃতিরই প্রতিনিধি। সত্যতা, প্রগতি ইত্যাদির ধারণাকেও তাঁরা বিস্মৃত করে চলেছেন। সংস্কৃতি, সভ্যতা, প্রগতি ইত্যাদি প্রচলিত ধারণা থেকে ভিন্ন কিছু। উন্নত ভবিষ্যত্ সৃষ্টির প্রয়োজনে সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতি, সভ্যতা ও বর্বরতা, প্রগতি ও হুজুগ ইত্যাদি কথার অর্থ পরিবর্তিত বাস্তবতায় নতুনভাবে নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের মন-মানসিকতা উন্নত করতে হবে।

এক সময় সমাজে, প্রতিষ্ঠানে, রাজনীতিতে হীন-উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার দারুণভাবে বেড়ে গিয়েছিল। মানুষ বিভ্রান্ত ও প্রতারিত হচ্ছিল। মানুষ আলেম সমাজের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারিয়েছিল। তখন মানুষ আকৃষ্ট হয়েছিল গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদির প্রতি, দেখা দিয়েছিল শেরেবাংলা, ভাসানী, বঙ্গবন্ধু প্রমুখের নেতৃত্ব। ব্রিটিশ শাসনের অবসান, জমিদারি ব্যবস্থার বিলোপ, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির পর এখন দেখা যাচ্ছে—গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ইত্যাদির দারুণ অপব্যবহার। এ অবস্থায় মানুষ অসহায় বোধ করছে। ধর্মনিরপেক্ষতা যেভাবে প্রচার করা হচ্ছে তা দ্বারা সামাজিক অবক্ষয় বন্ধ হচ্ছে না। মানুষ পুরাতন পরাজিত সব সংখ্যার বিশ্বাসের দিকে চলে যাচ্ছে। হীন-স্বার্থান্বেষীদের নানা অংশ এই অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে। রাজনীতিতে ধর্ম হয়ে উঠেছে বিধায়ক শক্তি। এই ধর্মে যে যথেষ্ট ধর্ম আছে, তা নয়। এটা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থা নয়। এই অবস্থা থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। তার জন্য উন্নত রাজনৈতিক চিন্তা ও রাজনৈতিক দলের অবলম্বন লাগবে।

সামনের পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে গিয়ে প্রাণহীন  কৃত্রিম আনুষ্ঠানিকতা ও হুজুগে মত্ত না থেকে আমাদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের জন্য গুরুতর সব সমস্যার সমাধান করার সংকল্প নিয়ে কাজ আরম্ভ করতে হবে। গতানুগতিক নয়, চাই  প্রগতি।

নানা ক্ষেত্রে নেতৃত্বের অবস্থা, জনজীবনের অবস্থা, চিন্তা-চেতনা ও কর্মধারা অত্যন্ত খারাপ। এই খারাপ থেকে আমাদের উঠতে হবে ভালোর ধারায়। বাস্তবকে অস্বীকার করে নয়, আড়াল করে নয়, মোকাবিলা করে এগোতে হবে। কেবল উন্নয়ন দিয়ে—টাকা-পয়সা দিয়ে সব হয় না। সর্বোপরি রাধাকৃষ্ণের একটি উক্তি স্মরণ হচ্ছে। সভ্যতার ভবিষ্যত্ নিয়ে লিখতে গিয়ে ১৯৩০-এর দশকে তিনি লিখেছিলেন:

‘নিকৃষ্ট মনের প্রধান লক্ষণই হলো আত্মতৃপ্তি। উচ্চ আদর্শকে হারানোর চেয়ে বড় ক্ষতি আমাদের আর কী হতে পারে? জেগে উঠার চেতনা অন্তরে থাকলে চরম পাপীরও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হয় না। বিবেকের দংশনই মানুষকে নিয়ে আশার কারণ। বিবেকের দখল না থাকলে মৃত্যুর হিম নেমে আসে জীবনে। যিনি যত বেশি পরিণত, আদর্শে না পৌঁছা পর্যন্ত তিনি এত  বেশি অতৃপ্ত থাকেন।

জাতীয় জীবনে আদর্শহারা হয়ে আমরা সমূহ ক্ষতির মধ্যে পড়ে গিয়েছি। আসন্ন বাংলা নববর্ষে আমাদের কর্তব্য, বিবেককে জাগ্রত ও শক্তিশালী করে মানুষের উপর ভরসা রেখে, হীনতাবোধ ত্যাগ করে, নতুন ভবিষ্যত্ সৃষ্টির কাজে অগ্রসর হওয়া। চাই নতুন আশা ও সাহস।

লেখক: প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক