ড. মিল্টন বিশ্বাস
১০ এপ্রিল (২০১৯) রাতে ফেনীর সোনাগাজীর অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান মারা যাওয়ার পর বাংলাদেশের মানুষ যেন পাল্টে গেছে। নুসরাত জাহান তোমার জন্য দুঃখ আর ক্ষোভের আগুন জ্বলছে সারা দেশ জুড়ে। ফেনীর যে মাদ্রাসা আর পৌর স্কুলে তোমার বিচরণ ছিল সেখানকার প্রতিটি ধূলিকণা এখন তোমার শোকে কাতর। তুমি ছিলে আর দশজন সাধারণ মেয়ের মতো; হেসে-খেলে প্রকৃতির কোলে ছুটে বেড়াতে। অথচ তোমাকে কে বুদ্ধি দিয়েছিল যে নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া যায়? কে শিখিয়েছিল রক্ষণশীল সমাজের বেড়াজাল ছিন্ন করে থানা আর আদালতে যেতে? বাংলাদেশে যেখানে শহরাঞ্চলেও যৌন নির্যাতনের অনেক অভিযোগ লোকলজ্জার ভয়ে লুকিয়ে রাখার কথা শোনা যাচ্ছে, সেখানে গ্রামের একটি সহজ-সরল পরিবার থেকে আসা তোমার সাহস দেখে আমরা আজ বিস্ময়ে হতবাক। আর যখন আমরা বিভিন্ন সূত্র থেকে শুনেছি শরীরের ৮০ শতাংশ দগ্ধ হবার পর ঢাকায় নিয়ে আসার পথে তোমার ভাইকে বলেছিলে- ‘শিক্ষক আমার গায়ে হাত দিয়েছে, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবো’- তখন তোমার সাহসী ভূমিকার জন্য আমরা গৌরবান্বিত হয়েছি।
৬ এপ্রিল সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে কৌশলে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। নুসরাত কয়েকদিন আগে তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলা করেছিল, সেই ঘটনার জেরে ওই অধ্যক্ষের পক্ষের অপরাধীরা নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করে সফল হয়েছে। যৌন হয়রানির শিকার নুসরাত যখন বিচার চাইতে গেছে সেখানেও তাকে পুলিশি হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে। তদন্ত করার ক্ষেত্রে পুলিশের সদিচ্ছার অভাব আর প্রভাবশালীদের ক্ষমতার দাপটে সেই অধ্যক্ষ শিশুটিকে মৃত্যুর শীতল কোলে নিক্ষেপ করেছে অতি সহজে।
আসলে নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানির মাত্রা ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ঘটনা ও যৌন হয়রানির নানা সংবাদ আমাদের সমাজের সুস্থতার বিরুদ্ধে বড় ধরনের চপেটাঘাত। ভালো সমাজ হিসেবে নারী-পুরুষের সম-নিরাপত্তা ও সুস্থ বিকাশের সম-সুযোগ সৃষ্টির বিধান বজায় থাকা জরুরি। অথচ আমাদের সমাজের নারীর জীবন হয়রানি, ধর্ষণ আর এসিড সন্ত্রাসকবলিত হচ্ছে নিত্যদিন। এজন্য এ সমাজ কোনো সুস্থ সমাজের তালিকায় থাকতে পারে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে জ্ঞানার্জন, মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও সত্য অনুসন্ধানের তীর্থক্ষেত্র। এই তীর্থস্থান কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী-শিক্ষকের কুকীর্তিতে যেমন কালিমাযুক্ত হয়েছে, তেমনি হাসপাতালসহ রাস্তা-ঘাট, বাজার সর্বত্রই নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানির মাত্রা মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছেছে। আর আমাদের শহর-গ্রাম সর্বত্র যৌন হয়রানির তালিকা কেবলই দীর্ঘ হচ্ছে।
সমপ্রতি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বলেছে, ২০১৮ সালে দেশে অন্তত ৯৪০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের এক জরিপে এখানকার নারীদের জীবনে যৌন হয়রানির বীভত্স চিত্র উঠে এসেছে। (ইন্টারনেট সূত্র) অ্যাকশনএইডের জরিপে উত্তর দেওয়া নারীরা বলেছেন, সাধারণ মানুষ চলাচল করে এমন প্রায় সব জায়গায়ই তারা যৌন হয়রানির শিকার হন। ৮৫ শতাংশ নারী মর্যাদাহানিকর উক্তির শিকার হয়েছেন, ৪৬ শতাংশ নারী যৌনতাপূর্ণ অশ্লীল ভাষার মুখোমুখি হয়েছেন, ৪৮ শতাংশ নারীর বাসের চালক বা ভাড়া আদায়কারীর মুখে অবমাননাকর ভাষা শোনার অভিজ্ঞতা হয়েছে। উত্তরদাতাদের ৮৮ শতাংশ বলেছেন, বাজার বা বিপণিবিতানে সাধারণ মানুষও নারীদের উদ্দেশে অশ্লীল কথা বলেন। ৬৯ শতাংশ বলেছেন, দোকানের কর্মচারী বা বিক্রেতারা তাদের দেখে অশ্লীল মন্তব্য করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আদালত কর্তৃক নির্দেশিত ও ইউজিসির নীতিমালা মোতাবেক যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি রয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও গৃহীত হচ্ছে। কিন্তু মাদ্রাসা-হাসপাতাল-ক্লিনিক কিংবা বাজার আর রাস্তার হয়রানি বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা এখনো গৃহীত হয়নি। বর্তমান নারী প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা এলেও তারা নুসরাতের মতো পুলিশি সহায়তা না পাওয়ায় হয়রানি মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। পুলিশের নেতিবাচক ভাবমূর্তির কারণে জনসমক্ষে যৌন হয়রানির শিকার হয়েও নারীরা পুলিশের কাছে যান না। ওই জরিপে ৮১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা পুলিশের সহায়তা চান না। তাদের ৯৫ শতাংশ মনে করেন, পুলিশকে ঘটনা জানালে সমস্যা বাড়ে।
নুসরাত জাহান শিখিয়ে গেছে, এ দেশের নারীদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই; বরং যৌন হয়রানির শিকার হলে তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদ করে অভিযুক্তকে বিচারের সম্মুখীন করা দরকার। যৌন হয়রানি বন্ধ করতে না পারার দায় অবশ্যই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। যৌন হয়রানি বন্ধে আমাদের সুপারিশগুলো হলো—সরকারি বেসরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ প্রদানের জন্য স্বতন্ত্র সেল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অভিযুক্ত দোষী হলে তাকে মিডিয়ার মাধ্যমে সবার সামনে নিয়ে আসতে হবে। অভিযোগকারীকে পুলিশি নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে। নারী-পুরুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠানসহ রাস্তাঘাটে প্রচার-প্রচারণামূলক স্থায়ী সাইনবোর্ড টাঙানো দরকার। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সমাজ-রাষ্ট্রের সর্বস্তরে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা থাকতে হবে; তবে তার অপব্যবহার রোধে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা থাকা দরকার এবং সম্ভাব্য অপব্যবহার সম্পর্কে আউট লাইন লিপিবদ্ধ করে প্রচার করতে হবে। আর এসব নির্দেশাবলী অনুসরণের মধ্য দিয়ে যৌন হয়রানি বন্ধ করা সম্ভব হতে পারে। নুসরাতের ঘটনাই এদেশের শেষ ঘটনা হোক এই প্রত্যাশা আমাদের সবার।
n লেখক :অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
