আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদসহ মূল অভিযুক্ত তিনজন গ্রেফতার

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৯, ২২:৩৯

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার মামলায় মূল অভিযুক্ত নূর উদ্দিনসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পৃথক তিনটি দল গতকাল শুক্রবার সকালে ও বৃহস্পতিবার রাতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে নূর উদ্দিন ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌল্লার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তাকে শুক্রবার ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঢাকা থেকে সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম এবং চট্টগ্রাম থেকে মাদ্রাসা ছাত্র জাবেদ হাসানকে গ্রেফতার করে পিবিআই। এ নিয়ে এই মামলায় ১২ আসামিকে গ্রেফতার করল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তবে গতকাল বিকাল পর্যন্ত গ্রেফতার হয়নি ফেনী সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রলীগ সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম ও মামলার বাদির বন্ধু মাদ্রাসার হেফজখানার শিক্ষক আব্দুল কাদের। এখনো শনাক্ত হয়নি বোরকাপরিহিত সেই ৪ জনও। এদিকে নুসরাতকে হত্যার ঘটনায় প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে সারা দেশ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন মানববন্ধন ও সভা-সমাবেশ করে বর্বর ও ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদ করছেন। তারা বলছেন, এ ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক তাদেরকে চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক— যাতে কাউকে ভবিষ্যতে যেন এমন পরিণতি বরণ করতে না হয়।  অন্যদিকে, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার যে ভবনের ছাদে নিয়ে শরীরে আগুন দেওয়া হয়েছিল সেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কর্মকর্তারা। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তারা নুসরাতের বাড়িতে যান ও তার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান।

যেভাবে গ্রেফতার নূর উদ্দিন

মামলার দুই নম্বর আসামি হলেন নূর উদ্দিন। ঘটনার পরই এই আসামি এলাকা থেকে পালিয়ে যান। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও তাকে গ্রেফতারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। পরবর্তীকালে মামলাটির তদন্তভার পিবিআইতে স্থানান্তর হলে আসামিদের গ্রেফতারে জোর তত্পরতা দেখা যায়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পিবিআই জানতে পারে যে, নূর উদ্দিন ময়মনসিংহের ভালুকার একটি বাড়িতে আত্মগোপনে আছেন। ওই বাড়িটি উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের আমতলী এলাকার আকবরের যিনি এই আসামির পূর্বপরিচিত। গতকাল বেলা সাড়ে ১০টার দিকে ওই বাড়িতে অভিযান চালায় পিবিআই।

ভালুকার সিডস্টোরে অবস্থিত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অফিস। সেখানে উপস্থিত কয়েকজন লোক ফেনীর সোনাগাজীর আকবর নামের এক লোকের ব্যাপারে জানতে চান। তখন সেখানে উপস্থিত লোকজন বলেন, আকবর নামে এক লোক সিডস্টোরের আমতলী এলাকার আব্দুল মজিদের কাছ থেকে চার বছর আগে জমি কিনে টিনশেডের একটি বাড়ি করেছেন। পরে তারা আকবরের বাড়িতে যান। ওই বাড়ির একটি কক্ষে গভীর ঘুমে তখন আচ্ছন্ন ছিলেন নূর উদ্দিন। বাড়ির দরজা ধাক্কা দেওয়ার পর সেটি খুলে দেন একজন। তখন একটি কক্ষের খাটে ঘুমাচ্ছেন এই আসামি। ওই অবস্থায় তাঁকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে নিয়ে দুটি সাদা রঙের মাইক্রোবাস আমতলী এলাকা ছেড়ে চলে যায়।

এদিকে পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলমকে বৃহস্পতিবার রাতে ফকিরেরপুলের একটি হোটেল থেকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই। পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, ‘মাকসুদ ঘটনার পর থেকে ঢাকার বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করছিলেন। গোপন সংবাদ পেয়ে তাকে আমরা একটি হোটেল থেকে গ্রেফতার করি। মাদ্রাসা ছাত্র জাবেদ হাসানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে নিয়ে অন্য আসামিদের গ্রেফতারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে।’

মাকসুদকে ১০ দিনের রিমান্ডে চেয়েছে পিবিআই। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফেনীর পিবিআই পরিদর্শক মো. শাহ আলম জানান, ফেনীর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক ১৫ এপ্রিল শুনানির জন্য দিন ঠিক করে দেন।

গ্রেপ্তারকৃতদের থেকে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই

পিবিআই সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাসহ গ্রেফতারকৃত আসামিদের কাছ থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলো যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বোরখা পরিহিত ওই ৪ জনের বিষয়ে জানার জন্য গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। এ মামলায় যেসব আলামত পাওয়া গেছে সেগুলো থেকে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করার চেষ্টা চলছে। এজন্য এসব আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

সূত্র জানায়, নুসরাতকে কে ডেকে নিয়েছিল, ছাদে কিভাবে দাহ্য পদার্থ গেলো, বোরখা পরিহিত ৪ জন কারা ছিলো, তারা কিভাবে অধ্যক্ষের অফিস ভবনের ছাদে গেল, নুসরাতকে আগুন ধরিয়ে খুনিরা কোথা দিয়ে পালিয়ে গেলো এসব বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করছে তদন্ত সংস্থার দলটি। এছাড়া অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে মামলা ও জেলে যাওয়ার কারণে মামলা তুলে নিতে তার পরিবারকে কারা হুমকি দিয়েছিলো—সেই ঘটনাও তদন্ত করা হচ্ছে। অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পিছনে কাদের ভূমিকা ছিলো, অর্থ যোগান দিয়েছে কারা এসব নিয়েও তদন্ত চলছে।

‘মূল ভূমিকায় নূর উদ্দিন’

সূত্র জানায়, নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার নেপথ্যে  ওই মাদ্রাসার সাবেক ছাত্র নূর উদ্দিন মূল ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের সদস্যদের। অধ্যক্ষের প্রধান ক্যাডার নূর। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বললে তাকে শায়েস্তা করার জন্য সে দলবল নিয়ে কাজ করত। এসব অপকর্মের শেল্টার দেওয়ার অভিযোগ কাউন্সিলর মাকসুদ আলমের বিরুদ্ধে। তিনি অধ্যক্ষের পক্ষে মানববন্ধন করেছেন। সোনাগাজী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন ও সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম খোকনের মধ্যে মাদ্রাসার কমিটির আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। রুহুল আমিন মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি। অন্যদিকে রফিকুল ইসলাম খোকন সোনাগাজী পৌরসভার মেয়র। এই দুই নেতার দ্বন্দ্বও তদন্ত করছে পিবিআই।