তার ক্যানভাসে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে চিরন্তন বাংলার লোকগাথা, ফুল, পাখি, টেরাকোটার নান্দনিকতা এবং কাঁথাশিল্পের আলঙ্কারিক উপাখ্যান। কখনো কখনো কাগজ দিয়ে করা ছোট আকৃতির নানা কোলাজ জাপানের পত্রপত্রিকা কেটে লাগানো। এভাবে ঐতিহ্য আর উত্তর-আধুনিক শিল্পভাবনা মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে অন্য এক জগত্। চোখজুড়ানো উজ্জ্বল রঙের ক্যানভাসে বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবনধারা, প্রাচীন কাব্য ফুটে উঠেছে। বারবার উঠে এসেছে টেরাকোটা, নকশিকাঁথা, মৈমনসিংহ গীতিকার আখ্যান এবং পটচিত্রের মতো লোকজ সংস্কৃতি থেকে নেওয়া নানা মোটিফ। ছবির অংশ হিসেবে ক্যানভাসের নিচে শিল্পীজুড়ে দিয়েছেন দেশজ নানা প্রাচীন গল্প এবং গীতিকাব্য থেকে আহরিত অংশবিশেষের লিপি। তিনি শিল্পী আবদুস শাকুর শাহ্।
সমকালীন শিল্প তাঁর ক্যানভাসে দেশজ শিল্পের নতুন মাত্রা খুঁজে পায়। শিল্পী জীবনের শুরুতে অনেকেই ঐতিহ্যের আশ্রয়ে সমকালীন চিত্রকলার প্রতি ঝোঁকে। কিন্তু ধৈর্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই নিজের শিল্পভাষা খুঁজে না পেয়ে আশ্রয় নেয় পশ্চিমানির্ভর শিল্পধারার প্রতি। আবদুস শাকুর শাহ্ সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। আধুনিক ধারায় বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যকে তুলে আনেন তিনি। বিশ্ব শিল্পকলার ধারায় চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্যকে তুলে ধরবার প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি।
যামিনী রায়ের পটচিত্র ও টেরাকোটার রেখাধর্মী অনুবাদ, অবণীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মোটা তুলির আঁচড়ে লোককলার আশ্রয়ে ছবি আঁকা, নন্দলাল বসুর লোকশিল্পের রেখা ও বর্ণ নিয়ে যে ‘হরিপুরা কংগ্রেস চিত্রমালা’ আঁকলেন তা বাংলার চিত্রকলায় স্বদেশকে খুঁজে নেওয়ার একটা পথ তৈরি করে। এরপর জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, রশীদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী দেশজ ঐহিহ্যের শিল্পের আশ্রয়ে বাংলার আধুনিক শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। সেই ঐতিহ্যের ধারায় বাংলার চিত্রকলায় মাটিঘনিষ্ঠ একেবারে নতুন চিত্রধারা নিয়ে উপস্থিত হন শিল্পী আবদুস শাকুর শাহ্।
শাকুর শাহ্-এর চিত্রকর্মের মূল্যায়ন করতে গিয়ে প্রখ্যাত চিত্র সমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ বলেন, মৈমনসিংহ গীতিকা বাংলাদেশের-বাঙালির প্রধান সাহিত্যিক দলিল। এই কবিতায় হাওর-বাঁওড়সমৃদ্ধ জল-সচল ভূপ্রকৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠা নর-নারীর সম্পর্ক বিশেষ করে প্রেম প্রধান উপজীব্য। মানুষের মনোবেগ জলের মতো বিচিত্রভাবে প্রবাহমান, নিসর্গের মতোই পল্লবিত ও প্রফুল্ল। শাকুর এই প্রফুল্ল প্রকৃতির শিল্পী। তাঁর পূর্বজ শিল্পীদের মতো লোকশিল্পকে তিনি অনুসরণ করেননি। বর্ণের উজ্জ্বলতা, অলঙ্কারধর্মিতা আর রেখার বাঁকানো ও নমিত আচরণে শাকুর মানব-মানবী, নদী-খাল, ঝাড়-জঙ্গল, পশু-পাখি এঁকেছেন। বেতে বোনা পাটি আর নকশিকাঁথার ব্যাকরণ মেনে তিনি স্পেস ভাগ করেছেন যেন। তা ছাড়া তার কাজে যে আখ্যানধর্মিতা আছে তাতে পটের মাহাত্ম্যও যুক্ত হয়েছে।
ছবি আঁকা খুব সহজ কাজ নয়। আবার ভালো ছবি আঁকা শুরু করলেও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখাও শিল্পীর জন্য খুব কঠিন। শিল্পী জীবনের শুরুর দিকে আমিও আর সবার মতোই জল রঙে ল্যান্ডস্কেপ, অ্যাক্রেলিকে বিমূর্ত ধারার ছবি এঁকেছি। ওইসব বিষয়ের মধ্যে আমি নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আমার শিল্প ধারণা বদলে দিয়েছিলেন আমার গুরু। যখন আমি পড়াশোনার জন্য ভারতে যাই, বলছিলেন শিল্পী আবদুস শাকুর শাহ্।
গত বুধবার উত্তরায় তার বাসায় বসে কথা হয় শিল্পীর সঙ্গে। ঘরে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে ছবি বই। খুব আটপৌরে জীবনযাপন তার। অথচ ক্যানভাসে কী অনন্য সাধারণ উপস্থিতি। কাজ করেন বাড়ির নিচতলায় তার ছোট্ট স্টাডিতে।
শাকুর শাহ্ বলেন, ‘১৯৭০ সালে স্নাতক শেষ করে ১৯৭৮ সালে ভারতের বরোদার এমএস বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য যাই। সেখানেই সান্নিধ্য পাই আমার গুরু প্রখ্যাত শিল্পী কে জি সুব্রমানিয়ানের। তিনিই আমাকে ভেঙে ভেঙে বুঝিয়েছেন কোনটা আধুনিক চিত্রকলা। একটি আধুনিক চিত্রকলা কখন আধুনিক হয়ে ওঠে। কীভাবে ঐতিহ্যের আশ্রয়ে চিত্রকলা আধুনিক করে আঁকতে হয়। তিনি বলেছিলেন, ‘দেখো শাকুর কোনো শিক্ষক কোনো ছাত্রকে শিল্পী বানাতে পারবে না। তার নিজের চর্চার মাধ্যমেই সে শিল্পী হবে। তোমার দেশে প্রচুর বিষয়, অনেক রকম বিষয়। তুমি তোমার দেশকে দেখো, দেশের বিষয়কে খুঁজে বের করো। সেই বিষয়কে অবলম্বন করে যদি তুমি সামনে যেতে পারো তাহলে হয়ত একদিন তুমি বলতে পারবে তোমার ছবি আঁকা হচ্ছে। সারা পৃথিবীতে লাখ লাখ পেইন্টার। তাদের অনেকের ছবি বিক্রি হয়, ভালো দামেই বিক্রি হয়। কিন্তু এরমধ্যে অল্প কজন শিল্পীই সামনে আসে। মানুষ তাদের মনে রাখে যারা নিজেকে অনন্য মানে নিয়ে যেতে পারে। যেমন পিকাসো অনেক ছবি এঁকেছেন। কিন্তু তার ‘গোয়ের্নিকা’ চিত্রকর্মটি পিকাসোর সিগনেচার।’ স্যারের সেই কথাগুলো আমাকে ভাবাত। আমি আশঙ্কায় ভুগতাম। স্যার যেভাবে বলছেন, সেভাবে কি আমার পক্ষে আঁকা সম্ভব!’
দেশে ফিরে আসার পর নানাভাবে ছবি আঁকা শুরু করলাম। কিন্তু সেখানে নিজেকে খুঁজে পাই না। ১৯৯১ সালে আমি জাপানে একটি প্রতিযোগিতায় ছবি পাঠানোর জন্য তিনটি ছবি আঁকলাম। তখন আমি বাংলার লোকজ বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। এটা অনেকেই করেছেন— কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী, রশীদ চৌধুরী। আমি আমার মতো করে আঁকার চেষ্টা করলাম। আমি শীতল পাটি থেকে কিছু মোটিফ নিলাম। তা নিয়ে মিনি সাইজে আমি ওপেক ওয়াটার কালারে কিছু ছবি আঁকলাম। আমার সেই ছবিগুলো মূল্যায়ন করল। আমিসহ পাঁচজনকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। তখন সেই প্রতিযোগিতার পরিচালক আমাকে বলেছিলেন, তোমার ছবিতে তোমার দেশকে পাওয়া যায়। তার এই মন্তব্য আমার ছবি আঁকার ভুবন বদলে দিল। এই আমি যেন আমার পথ খুঁজে পেলাম। ধীরে ধীরে আমি বাংলার মোটিফ জোগাড় করলাম। কলকাতায় গুরুসদয়ের জাদুঘর রয়েছে। সেখান থেকেও বেশকিছু মোটিফ পেলাম। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মোটিফ জোগাড় করলাম। এরপর আমার মতো করে পোস্ট মডার্ন টাইপ ফর্মে আঁকলাম। হুবহু না এঁকে আমার মতো করে আঁকলাম। আমার সেই স্টাইলটা সব মহলেই প্রশংসিত হলো।
শাকুর শাহ, আমাদের দেশের অন্যতম এই শিল্পীর জন্ম বগুড়া জেলায় ১৯৪৬ সালে। পুরো নাম আব্দুস শাকুর শাহ। শিল্পী শাকুর শাহ নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। বাবা ওসমান আলী শাহ। তিনি ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। বগুড়াতেই চাকরি করতেন। মা হালিমা খাতুন। শাকুর শাহ ৯ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সপ্তম। প্রাথমিক লেখাপড়া বগুড়াতেই। সেখান থেকেই এসএসসি পাস করেন। পরিবারের ভাইবোনেরা অন্য পেশায় জড়িত। একমাত্র শাকুর শাহ-ই শিল্পী হয়েছেন।
