এনজিও ব্যুরোতে জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদন

‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরকারবিরোধী প্রচারণা, ত্রাণ কাজে রমরমা বাণিজ্য’

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০১৮, ১৮:৫৫
হত্যা-নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সেবায় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে এনজিও ব্যুরোর অনুমোদন নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৯২টি কর্মসূচিতে কাজ করছে ৯২টি এনজিও। আর অসহায় রোহিঙ্গাদের ঠকিয়ে রমরমা বাণিজ্য করছে দেশি-বিদেশি এনজিওগুলোও। পাশাপশি এনজিওগুলোর সরকারবিরোধী প্রচারণা, জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে দ্বিতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া, রোহিঙ্গা শিশুদের বাংলা ভাষায় পাঠদানসহ নানা বির্তকিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া এবং ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম করায় তাদের বিরুদ্ধে সুপারিশ গেছে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোতে।
 
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন গত ৪ জানুয়ারি রোহিঙ্গাদের মধ্যে এনজিওগুলোর ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম নিয়ে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক বরাবর এক প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। তাতে বেশ কয়েকটি এনজিওর নাম উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এনজিওগুলো কেবল আর্থিকভাবেই অনিয়ম করছে না, তারা এখতিয়ার বহির্ভূত কার্যক্রমও পরিচালনা করছে। দোষী এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছেন তিনি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছেও প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছেন ডিসি।
 
প্রতিবেদনে ত্রাণ বিতরণে সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল, অগ্রযাত্রা বাংলাদেশ, কাতার চ্যারিটি, আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশন, সোশ্যাল এজেন্সি ফর ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট ইন বাংলাদেশ (ছওয়াব), প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, নেটওয়ার্ক ফর ইউনিভার্সেল সার্ভিসেস অ্যান্ড রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট (নুসরা), দুস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ইউনাইটেড সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্টের (ঊষা) বিরুদ্ধে অনিয়ম পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
 
এর মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, খোলাবাজার থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে ডাল কিনে প্যাকেটে ভরে রোহিঙ্গাদের দিয়ে প্রতি কেজি ডালের প্যাকেজিং খরচ দেখানো হচ্ছে ৯৩ টাকা! শুধু ডাল প্যাকেটজাত করে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করে বাড়তি খরচ দেখিয়ে ১৭ লাখ টাকা পকেটে ভরেছে এই এনজিও। তদন্তদল হিসাব করে দেখেছে, এনজিওটি শুধু ডাল প্যাকেজিংয়ে বেশি খরচ দেখিয়ে ১৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়া এনজিওটি জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই চাইল্ড রিক্রিয়েশন সেন্টার নির্মাণ করেছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
 
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের তিন হাজার টাকা দামের ডিগনিটি কিট্স দেওয়ার কথা থাকলেও জেলা প্রশাসনের তদন্ত দল সরেজমিনে গিয়ে ৯০০ টাকার ডিগনিটি কিট্স পায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন থেকে ডিগনিটি কিট্স সরবরাহের ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক। কাতারভিত্তিক এনজিও কাতার চ্যারিটির কথা উল্লেখ করা টেলিফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে নুসরা, দুস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ঊষা সম্পর্কে বলা হয়েছে, এরা এনজিও বিষয়ক ব্যুরো থেকে কোনো ধরনের ত্রাণ সরবরাহের বরাদ্দপত্র পাচ্ছে বা কোনো ধরনের ত্রাণ সরবরাহ করছে সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে কিছুই জানাচ্ছে না। ছওয়াব নামের একটি এনজিওর ১১ লাখ টাকার ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার কথা। কিন্তু জেলা প্রশাসন থেকে সরেজমিনে গিয়ে সেখানে মাত্র চার লাখ টাকার ত্রাণসামগ্রী দেখা যায়। তখন চার লাখ টাকার ত্রাণ ছাড় করেনি জেলা প্রশাসন। পরে এনজিওটি বাকি সাত লাখ টাকার ত্রাণ নিয়ে আসে। আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের নামে ১৮টি বরাদ্দপত্র পায় তদন্ত দল। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিওটির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রথম দিকে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে তথ্য জানানো হতো। তবে কিছুদিন ধরে এনজিওটি তা আর জানাচ্ছে না।এ ছাড়া এনজিওটি মধ্যরাতে গ্যাস সিলিন্ডারের ট্রাক নিয়ে নিয়ম বহির্ভূতভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঢোকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
 
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ৯টি এনজিওর অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন, বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশুয় নেওয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য ৯২টি এনজিও জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে কিছু এনজিওর কার্যাবলিতে অনিয়ম পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা অনাকাঙ্খিত।
 
অপরদিকে রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত এনজিওগুলোর ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম সরকারবিরোধী প্রচারণা, জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে দ্বিতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া, রোহিঙ্গা শিশুদের বাংলা ভাষায় পাঠদানসহ নানা বির্তকিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া আরও সাত এনজিও’র বিতর্কিত কার্যক্রমের প্রমাণ গোয়েন্দা নজরদারিতে পাওয়ার পর তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোতে আরও একটি সুপারিশ পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে এসব এনজিও’র কার্যক্রমের বিষয়েও জানানো হয় ব্যুরোকে।
 
কক্সবাজার পুলিশ সুপার(এসপি) ড. এ কে এম ইকবাল হোসাইন বলেন, কিছু এনজিও বির্তকিত কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এদের তদারকি দরকার। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতিক্রমে খুব দ্রুত সেখানে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হবে।
 
কক্সবাজারের আরআরআরসি’র কমিশনার আবুল কালাম বলেন, বেশিরভাগই এনজিও আরআরআরসি’র সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। তবে কিছু এনজিও তথ্য দিতে একটু গড়িমসি করে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে।
 
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, এনজিওগুলোর কার্যক্রমের ওপর প্রতিবেদন তৈরি করে ব্যুরোতে পাঠানো হয়েছে ৪ জানুয়ারি। প্রতিবেদনে সাতটি এনজিও’র কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। যেসব এনজিও বির্তকিত কাজে জড়াবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 
ইত্তেফাক/এমআই