এক হাতে বিদায়, অন্যহাতে বরণ। ঘড়ির কাঁটায় রাত বারোটায় বাংলা পঞ্জিকার দিন শেষ হয় না শেষ হয় সন্ধ্যার প্রারম্ভে, সূর্যাস্ত দিয়ে। আবার নতুন দিনের সূচনা হয় সূর্যের উদয় দিয়ে। ‘সংক্রান্তি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন, সঞ্চার, ব্যাপ্তি। বাংলা মাসের শেষ দিনটিকেও বলা হয় সংক্রান্তি। চৈত্র মাসের শেষ দিন তাই চৈত্রসংক্রান্তি। লাগোয়া সূর্যোদয়টি নতুন বছরের সূচনা সময়, নববর্ষ। বাঙালি যুগ যুগ ধরে চৈত্রসংক্রান্তি আর নববর্ষ ঘটা করে পালন করে এসেছে। অবশ্য চৈত্রসংক্রান্তি সব বাঙালির উত্সব নয়, সনাতন ধর্মের বাঙালি এবং কোনো কোনো ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ এই দিনটি নানা আচার-আনন্দে উদ্যাপন করে। এটি আসলে একটি লোকউত্সব। শাস্ত্র যে নেই তা বলা যাবে না। এই দিনে স্নান, দান, ব্রত, উপবাস চলতে থাকে। চৈত্র মাস জুড়েই চলে উপবাস। ভিক্ষান্ন ভোজন পালন শেষে হয় চড়ক পূজা। চড়ক গাজন উত্সবেরই একটি অংশ। পুরনো দিনের লোকশ্রুতি, সামাজিক সাংস্কৃতিক বিবরণ সাক্ষ্য দেয় নানা আনুষ্ঠানিকতার। চৈত্রসংক্রান্তি একটা উপলক্ষ। যারা এদিনটি মান্য করেন, তাঁদের মধ্যে আনন্দ সৌহার্দ্যের আবহ তৈরি হয়। এক গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা বের হয়ে চলে যায় অন্য গ্রামের শিবমন্দির প্রাঙ্গণে। মানুষের মনে ভেসে থাকে কত স্ফূর্তির আমেজ। কেউ শিব সাজে কেউ হয় গৌরী। ভক্তদের কেউ কেউ নন্দী, ভৃঙ্গী, ভূত-প্রেত, দৈত্যদানো সাজতেও পিছপা হয় না। ঢোলের উচ্চকিত আওয়াজ, নাচের তরঙ্গ আর শিবকীর্তন—সব মিলিয়ে আনন্দের স্রোতধ্বনি। কেন শিবের নিদ্রভঙ্গ হলো—তার বিয়ে—ইত্যাদি বিষয়ের সঙ্গে যোগ হয় কৃষিকাজের কথা; সবই আধোসুরে ছড়ার ছন্দে। আনন্দের আতিশয্য বলে একটা কথা আছে। তাও চোখে পড়ে পুরনো দিনের চড়ক উত্সবের বয়ানে। শূল ফোঁড়া, বাণফোঁড়া—এগুলো তো ঝুঁকিপূর্ণ এবং কষ্টসাধ্য কাজ। পিঠে বড়শি গেঁথে চড়কগাছে ঘোরা ভয়ঙ্কর কাজই ভক্তরা করত। এখন অবশ্য এমন ভয়াবহ ভক্তিপ্রথার চল নেই। চৈত্রসংক্রান্তির আনন্দটা আছে, ভক্তি নিবেদনও আছে। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ‘ত্রিপুরা’দের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই আর চাকমাদের বিজু উত্সব বেশ আনন্দমুখর।
চৈত্রসংক্রান্তির নিবেদন বর্ণাঢ্য বিনোদনের মধ্যেই বিদায় নেয় বাংলা সনের শেষ মাসের শেষ দিনটি। উত্সবের আনন্দের মধ্যেও যুক্ত হয় বেদনার সুর, বিদায়ের বিদুরতা। বহু ঘটনা, সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব চুকে একটি সূর্যাস্ত ঘোষণা করে বছরের শুভ অবসান। বাতাস বেয়ে আসে মৃদুধ্বনি, ‘বত্সরের শেষ গান সাঙ্গ করি দিনু অঞ্জলি/নিশীথগগনে’। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, নতুন সূর্য উঠবে, সূচিত হবে নতুন বছরের, নতুন মাসের। আসলে কি উদয় ঘটে নতুন সূর্যের! পুরনো সেই সূর্যই তো আজ উঠেছে, যা প্রতিদিন ওঠে। তবু যেন মনে হয় সূর্যের নতুন উদয়। প্রকৃতির সারা অঙ্গ গাইছে ‘নব আনন্দে জাগো’।
আনন্দটা কিসের? প্রত্যাশার, সম্ভাবনার, নাকি ঐতিহ্যের অহংকার। বাংলা নতুন বছরের উত্সব তো আমাদের জাতিসত্তার অস্মিতাও। বলার অপেক্ষা রাখে না, ‘নববর্ষ’ বরণ, বাঙালির জাতীয় উত্সব। উত্সবপ্রিয় জাতি হিসেবে বাঙালির খ্যাতি চিরকালের। পাল-পার্বণের শেষ নেই। আমাদের আছে ধর্মীয় উত্সব, সামাজিক উত্সব, রাজনৈতিক উত্সব। তবে নববর্ষের উত্সবটি সর্বজনীন—সব বাঙালির। ধর্ম-বর্ণ নেই, বিত্ত-বৈভবের মাপজোখ নেই, সবাই বাঙালি—নববর্ষ সব বাঙালির প্রাণের উত্সব।
লোকাচার ধর্মাচার বা সাংস্কৃতিক চেতনার ধারাবাহিকতায় বাংলা নতুন বছর বরণের রেওয়াজ তো ছিলই। জীবন-বাস্তবতার মধ্যেও চৈত্র-বৈশাখ স্মরণ করার যুক্তি আছে। সাতচল্লিশে দেশ ভাগ হলো। তবে পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাটের দশকে এসে বাঙালির চিরকালীন সামাজিক চেতনার নববর্ষ সাংস্কৃতিক চেতনার আনুষ্ঠানিক এক রূপ লাভ করল। ১৯৬৭ সালে ছায়ানট প্রথমে ঢাকার বলধা গার্ডেনে পরবর্তী সময়ে রমনা বটমূলে শুরু করল বাংলা নতুন বছর বরণের অনুষ্ঠান। সেটি আজো প্রবাহিত আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগের মঙ্গল শোভাযাত্রার যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে। অশুভ-অমঙ্গল দূর করে শুভচেতনার জয় প্রতিষ্ঠায় এই মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রকাশ করে নানা প্রতীকে। ২০১৬ সালে এটি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করে ‘মানবতার অমূল্য ঐতিহ্য’ হিসেবে। একটা সময়ে নববর্ষ উদ্যাপনের অনুষ্ঠানমালা ঢাকার রমনা এলাকায় বিস্তৃত ছিল। এখন আর তা নেই। নগরীর বিভিন্ন এলাকা—ধানমন্ডি, গুলশান, উওরা, পুরান ঢাকা—সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। মনে হয়, শহরের সব উদ্যান, মাঠ, পথ, অলিগলিতে ভেসে থাকছে রঙিন মানুষের ঢেউ। বর্ষবরণের বড় অংশ হচ্ছে হালখাতা। এটি মূলত ব্যবসায়ীদের একটি আচার। প্রতি বছর চৈত্রের শেষ দিন পর্যন্ত বেঁচাকেনার জের টানা। পুরনো হিসাব শেষ করে পয়লা বৈশাখে নতুন হিসাব খোলা। হালখাতার অর্থই হলো হিসাব হালনাগাত করা। এ যুগে এসে হালখাতার প্রচলন কমে এলেও একেবারে উঠে যায়নি। বিশেষ করে আড়তদারি যাঁরা করেন, তাঁদের মধ্যে হালখাতার প্রচলন এখনো রয়েছে। আমাদের শৈশবে হালখাতা উত্সবের জেল্লা দেখেছি। সারা বছরের অপেক্ষা এই হালখাতার জন্য। দেখতাম গদিতে গদিতে ব্যাপক আয়োজন। হিন্দু সম্প্রদায়ের হালখাতায় কিন্তু ধর্মাচার যোগ হতো। এছাড়া অন্যদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে থাকত নতুন খাতা খোলার আয়োজন। ঝাড়পোছ করে ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠানে আনা হতো নতুন আবহ। রঙিন কাগজের নিশান ঝুলত আড়াআড়ি টাঙানো সুতায়। ধূপধুনোর পূতাগ্নি জ্বলত। সন্ধ্যায় মোম জ্বলত সুদৃশ্য ঝাড়ে। আর সবার জন্য থাকত আঢেল মিষ্টান্ন। সারা বছর যারা কেনাকাটা করেছেন তাঁরা আসতেন কেতাদুরস্ত হয়ে। হালখাতায় নাম লিখিয়ে নতুন হিসাব খুলতেন। খুঁতি থেকে টাকা বের করতেন। সেই টাকা তখনই সিন্ধুক বা ক্যাশ বাক্সে তোলা হতো না। গদিবিছানায় রাখা বগিথালায় সাজিয়ে রাখা হতো, যাতে সবাই দেখে নতুন বছরের প্রথম দিন আমদানি কেমন হয়েছে।
বৈশাখী মেলা ছিল গ্রামীণ জনপদের নতুন বছরের অনিবার্য আয়োজন। কোনো কোনো মেলা বসত চৈত্রসংক্রান্তির দিন, চলত পহেলা বৈশাখ বা তার পর পর্যন্ত। আমরা বলতাম ‘পরব’। এ উপলক্ষে বাড়ির ছোটরা বড়দের কাছ থেকে ‘পরবি’ পেত। যা জমত, মেলায় কেনাকাটা করে উড়িয়ে দেওয়ার সে যে ছিল কী আনন্দ! চারআনায় মিলত হাতির দাঁতের বাঁটের ছোট চাকু (আসলে হাতির দাঁত নয়, ছিল সাদা প্লাস্টিকের বাঁট, তখন কি আর এটা বুঝতাম!)। সামনেই তো আমের মরসুম। কাঁচা আম কাটার জন্য চাকু তো লাগবেই। আমাদের সঙ্গে বালিকারাও যেত। তারা কিনত আলতা, জলেভাসা সাবান, রঙিন ফিতা-চুড়ি, ক্লিপ, নথ, খাড়ু, বিছা—কত কী! বড়রা কিনতেন হাঁড়িকুঁড়ি, বাঁশের-বেতের নানা তৈজসপত্র। খেলনার দোকানের দিকে নজর ছিল একটু বেশি। সোলার পাখি ঝুলে আছে। মনে হতো এই বুঝি আকাশে উড়াল দেবে। বিন্নি ধানের খৈ, মুড়িমুড়কি, বাতাসা, কদমা, মোয়া, বৈয়ামে লোভনীয় লেবেঞ্চুস—কত কী! আমসত্ত্ব, আমড়া, তেঁতুলের আচার (জিভে, জল এসে গেল), বেতফল, মাখনা কেনায় মন পড়ে থাকত। কতরকম বাঁশি, ঢোল। বাড়ি ফেরার সময় হাতে হাতে নকশি হাঁড়ি। বাঁশি আর ঢোলের শব্দে ক’দিন তো পাড়ায় কান পাতা যেত না!
চৈত্রসংক্রান্তি, নববর্ষ, বৈশাখের আনন্দ আর কালবৈশাখীর তাণ্ডবের দুঃখ—এসব নিয়ে বাংলাভাষায় কম লেখালেখি হয়নি। আদিকালের কবি থেকে শুরু করে হালসময়ের কবি—কে লেখেননি এসব বিষয়ে দু-চার চরণ! বাংলার ঋতুবৈচিত্র্যের সৌন্দর্য তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কলমে বিস্তৃতি পেয়েছে। অন্যান্য ঋতুর মতো তাঁর বৈশাখের গান-কবিতাও মনস্পর্শী। তাঁর একটা গান—এসো এসো, এসো হে বৈশাখ এসো এসো... না গাইলে তো আমাদের বর্ষবরণই হয় না। সারা বছর হয়তো এ গানটি তেমন গাওয়া হয় না, কিন্তু পহেলা বৈশাখে হাজারোবার গীত হয়।
চৈত্র-বৈশাখের উপস্থিতি পাওয়া যায় সবযুগে, কাব্যআখ্যানে। মধ্যযুগের অন্যতম কবি মুকুন্দরাম (১৫৪০-১৬০০)। তাঁর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে কালকেতু ও ফুল্লরার দাম্পত্যজীবনের সুখদুঃখের বর্ণনায় বৈশাখের দাবদাহের চিত্র পাওয়া যায়—‘বৈশাখ অনলসম বসন্তের খরা।/ তরুতল নাহি মোর করিতে পসরা/ পায় পোড়ে খরতর রবির কিরণ।/ শিরে দিতে নাহি আঁটে খুঞ্চার বসন/ নিযুক্ত করিল নিধি সবার কাপড়।/ অভাগী ফুল্লরা পরে হরিণের দুড়’ সমকালে এসে কবি রফিক আজাদ যখন লেখেন—‘পহেলা বৈশাখে তুই বুক বেঁধে আশার আঁচলে/ নতুন দিনের স্বপ্নে মগ্ন হোস বিদ্যুত্ বিভায়!/ আলো ডোম্বী, অবিনাশী তোর স্বপ্ন জয়ী হতে দেখি/ সর্বদাই পহেলা বৈশাখে!’ রফিক আজাদের ডোম্বীকে আমরা জানি। বাংলাভাষার আদিরূপ চর্যাপদে বর্ণিত সেই নারী, নগরের বাইরে যার বাস, ব্রাহ্মণ তাকে স্পর্শ করে না। ডোম্বীরা এখনো আছে। তাদের বৈশাখী চেতনা কালবৈশাখীর ঝড়ে শুদ্ধ হওয়ার মধ্যেই রয়েছে জাতিসত্তার জয়।
চৈত্রসংক্রান্তি বলি আর বর্ষবরণই বলি—এগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিকতা আছে। শুরুটা কিন্তু বাণিজ্যিকতা দিয়েই। তবে এসবের যে সাংস্কৃতিক চেতনা, প্রবাহমানতা—এর স্থান শৈলচূড়ায়। পহেলা বৈশাখ, ভোর না হতেই নগরীতে যে মানুষের ঢল নামে, এর পেছনে সংস্কৃতির আলোটিই জ্বল্যমান। প্রশ্ন আসে, তা হলে কি আমরা শুধু ১লা বৈশাখেই বাঙালি হয়ে উঠি! আমরা কি সারা বছর বিজাতীয় সংস্কৃতিতে গা ভাসাই না! কথা সত্য। আমাদের জাতিসত্তা নিয়ে কোনো সংকট নেই, আছে ধারণের সীমাবদ্ধতা। এর কারণ বহুবিধ। বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো স্রোতই আটকে রাখা যায় না। পৃথিবীর সব রাষ্ট্র এখন ‘এক উঠোনের ঘর’, সবাই সবাইকে চেনে, জানে। সংস্কৃতিটা তো সংযোগেই সম্প্রসারিত হয়। আমাদের সন্তান ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছে, আমরা সুযোগ পেলেই ‘সুখের দেশ’-এ পাড়ি জমাচ্ছি। যোগাযোগ, আসা-যাওয়ার সহজলভ্যতা তো ভিন্নতা বয়ে আনবেই। তবে এসব নিয়ে হতাশার কিছু নেই। আমাদের বায়ান্ন আছে, একাত্তর আছে। ইতিহাসের পৃষ্ঠায়-পৃষ্ঠায় লেখা আছে বাঙালির গৌরবগাথা।
বাঙালি এখন সার বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। বিশ্বায়নের জ্বালা, বিদেশি সংস্কৃতির স্রোত উজিয়েও কিন্তু বাঙালি দাঁড়িয়ে থাকে। দেশে আমরা বিবাদ করি, বিদেশে তো এটা নেই। বাংলাভাষায় কথা বলা কেউ অন্য একজন বাংলাভাষী পেলে কাছে টেনে নেয়। অনেকে একত্রিত হয়, পালে-পার্বণে-উত্সবে যেতে ওঠে। ঘটা করে এরা নববর্ষ, একুশে ফেব্রুয়ারি, ছাব্বিশে মার্চ, ষোল ডিসেম্বর পালন করে। ঈদে, পূজায়, বড়দিনে মিলিত হয়। দেশে তো হয়ই।
আমরা বাঙালিরা নানা রঙ পছন্দ করি বটে। কিন্তু অন্যের রঙে আমরা নিজেদের রাঙাই না। চেতনার ভিতটি মজবুত থাকায়, প্রবাহিত থাকায়, আমরা এতকিছুর পরও বাঙালিই থাকছি। অন্য পাল-পার্বণের মতো বাংলা নতুন বছরের বর্ণাঢ্য উত্সবের বহুমুখিতা এ কথাই বারবার প্রমাণ করে।
