প্রথম দিন

এসো হে বৈশাখ...

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ১৯:৩৫

 

কিছু কিছু বিদায় নতুনত্ব বয়ে আনে। তেমনি একটি চৈত্রের বিদায়! এই বিদায়ে বাঙালির পরমানন্দ। চৈত্রের শেষ দিন পরই নতুন বছরের সূচনা পহেলা বৈশাখ। সবকিছু নতুন করে ভাববার দিন যেন।

পহেলা বৈশাখ বাঙালির বাঙালিয়ানার বহির্প্রকাশ। বিগত সময়ের জরাজীর্ণতাকে কাটানো আর নতুনকে শত আশায় বুকে ধারণ করার মানসিকতাই মানুষকে নবযাত্রার আনন্দে মাতিয়ে দেয়। কোনো উত্সব, পার্বণ না হয়েও বাংলা বর্ষবরণ হয়ে ওঠে সর্বজনীন মহোত্সব।

পহেলা বৈশাখের সকালে হালকা দমকা হাওয়ার তালে তরমুজ-বাঙ্গির ভেজা ভেজা মিষ্টি গন্ধটা নাকে না লাগলেই নয় যেন। এখনো গ্রাম-বাংলায় এই স্বাদটা রয়ে গেছে। সকালের নাস্তায় দই, সন্দেশ, রসমালাই, খির, চিড়া, মুড়ি, খই, গুড় না হলে বর্ষবরণটা যেন শূন্যই থেকে যায়।

পহেলা বৈশাখে কিছু অনুষঙ্গ বাঙালির আত্মার সঙ্গে মিলেমিশে পালনীয় ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। তার মধ্যে একটি হলো বৈশাখীমেলা। এই মেলায় থাকে বাহারি খাবারের পসরা, থাকে যাত্রাপালা, পুতুলনাচ, তরমুজ-বাঙ্গির বিশাল স্তূপ, তালের রস, বিভিন্ন ধরনের দেশীয় বাজনা, বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র, নারীদের জন্য চুড়ি-ফিতাসহ নানান কিছু, থাকে নাগরদোলা এবং শিশুদের জন্য হরেক রকম আয়োজন।

শহুরে জীবনের পহেলা বৈশাখ কিছুটা যান্ত্রিক বিনোদনের মতো হয়ে গেছে। তারপরও শহুরে বাঙালির মনটা এখনো রমনার বটমূলে টেনে নেয়। চারুকলা থেকে সাত সকালে মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালির বর্ষবরণে ভিন্নমাত্রা যুক্ত করেছে।

পহেলা বৈশাখ নিয়ে এখন চলে অনুদান আদায়ের হিড়িক (অনুদান নিয়ে রাস্তার মোড়ে মোড়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন, যারা অর্থ দিচ্ছে তাদের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান) আর জমজমাট ব্যবসা। একটি বিশাল অংশ এই মিলন উত্সবকে পুঁজি করে অর্থ আদায় করে চলেছে। পহেলা বৈশাখে আগে দোকানিরা হালখাতা করতেন। সারা বছরের পুরনো হিসেব চুকিয়ে নতুন হিসেবের খাতা খুলতেন। বাকিদাররা এদিন দোকানিদের পাওনা মিটিয়ে দিয়ে মিষ্টি মুখ করে, নতুন হিসেব নিয়ে বছর শুরু করতেন। কিন্তু এখন ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি এমনকি বড় বড় শিল্পপতিও দিনটিকে একটি বিশাল ব্যবসায়িক দিনে রূপান্তর করেছেন। গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যের বদলে মোড়ে মোড়ে দেখা যায় বিভিন্ন জিনিসের ছাড় দেওয়ার জটিল বিজ্ঞাপন। সর্বজনীন উত্সবটাই যেন এখন ব্যবসায়িক বাজি!

পহেলা বৈশাখ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে বাঙালির মান বাড়িয়েছে। মহাকালের পথে বৈশাখ ফিরে-ফিরে আসবে। স্মৃতি-বিস্মৃতির রোমন্থনে বাঙালির মন আনমনা হবে। পহেলা বৈশাখের ধরনও হয়তো আরো পালটাবে। কিন্তু কখনোই বাঙালির চেতনার মাধুর্য পালটাবে না!