অজয় দাশগুপ্ত
বৈশাখ আমাদের জাতীয় উত্সবের মাস। এ দিনটি এখন একদিকে যেমন উদযাপনের, আরেক দিকে ঐতিহ্যের। বোঝা জরুরি আজকের বাঙালি আর একাত্তরের বাঙালির মনোজগত্ এখন আর এক না। সে সময় বরং আমরা বেশি বেশি বাঙালি ছিলাম। যার মূল কারণ হয়তো রাজনীতি ও নেতৃত্ব। রাজনীতি তখন এক আদর্শ এক উদ্দেশ্যে ছুটছিল। তার সামনে তখন একটাই চাওয়া দেশ ও জাতির মুক্তি। আর নেতৃত্বও ছিলো দেখার মতো।
তখন নববর্ষ ছিলো প্রেরণা আর বাঙালি বোধের উত্সমুখ। আজ আর তা নাই। আজ তা কেবল এক আনন্দের ধারক। বাঙালির নববর্ষের সঙ্গে পান্তা ভাত আর ইলিশের কি সম্পর্ক কেউ জানেন? আজ কিন্তু ইহাই সংস্কৃতি। এতসব আধিপত্য আর বাঙালিত্ব হারানোর কালেও আমরা কিন্তু খড়কুটোর মতো বাংলা নববর্ষকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে আছি। কারণ তার ভেতরের তেজ ও শক্তি। দেশের বাইরে এখন প্রায় এক কোটি বাংলাদেশির বসবাস। যারা দেশ ও দেশের অর্থনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রকও বটে। এদের মাথায়ও নানা উগ্রতার পোকা কিলবিল করে। দীর্ঘকালের আবাসভূমি লন্ডনের দিকে তাকালেই বুঝবেন কোথায় আছি আমরা। এর পাশাপাশি চলছে বাঙালি হবার এক নতুন অধ্যায়। যার নাম প্রবাসের পহেলা বৈশাখ।
আমি যখন প্রশান্তপাড়ে অভিবাসন নিয়ে আসি তখন স্বপ্নেও ভাবিনি যে এ দেশে হাজার হাজার বাঙালির মিলনমেলা হতে পারে বৈশাখী মেলা; যার ভেতর থাকতে পারে ইতিহাস ঐতিহ্য আর নতুন প্রজন্মের আনন্দ ও শক্তির মেলবন্ধন। আশ্চর্যের বিষয়, ইতিহাস বা ঐতিহ্য সময় হলে নিজ থেকেই কথা বলে বলতে শুরু করে। তা না হলে সিডনির সবচেয়ে বড় বৈশাখী মেলাটি কেন বঙ্গবন্ধুর নামে হবে? তা ছাড়াও যে-কটি বৈশাখী মেলা হয় তার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধুর নাম। এই শক্তি অস্বীকার করার জো নাই।
সিডনি বা বিশ্বের নানা দেশে বাংলাদেশিদের যে বৈশাখী মেলা তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন প্রজন্মের আশা ও ভালোবাসা। অলিম্পিক পার্কের বিশাল মেলাটি তুলে এনেছে এমন সব তরুণ তরুণীকে— যারা বাংলায় কোনো অনুষ্ঠান করবে বা করতে পারে সে ধারণাই করতে পারেনি অনেকে। তারা করছে। শুধু করছে বললে ভুল হবে ব্যাপকভাবে করে তাদের জীবনে বাংলাদেশ ও বাংলার অস্তিত্ব তুলে ধরছে। আমি মনে করি অলিম্পিক পার্কের মেলাটি সে কারণেই সময়ের বরমাল্য পাবে একদিন। এই মেলা আন্তর্জাতিক পরিধিকেও বড় করে তুলেছে। যোগ হয়েছে, নানা দেশ ও সংস্কৃতির মানুষ। তারা আমাদের সংস্কৃতি, দেশের ঐতিহ্য, রাজনীতি, পোশাক, খাবার জানছে, চিনতে পারছে। এভাবেই তো গড়ে ওঠে মূল্যবোধের নতুন স্তর। তৈরি হয় নতুন এক পৃথিবীর ভাবনা। নতুন বললাম এই কারণে- হানাহানি কলহ আর রক্তপাতের বিশ্বে আজ আবার মৈত্রী আর সম্মিলন জরুরি। আপনাকে মানতেই হবে, ভেতরের রুচি আর মূল্যবোধ ছাড়া আপনি এই দানব ঠেকাতে পারবেন না। পহেলা বৈশাখের ভেতর সে শক্তি আছে। আছে বলেই মৌলবাদ তাকে ভয় পায়। এই শক্তি কাজে লাগাতে হবে।
n লেখক :প্রবাসী প্রাবন্ধিক
