বৈশাখ হোক সবার জন্য রঙিন

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৩৭

সাজ্জাদ হোসেন

পহেলা বৈশাখ কথাটি কল্পনা করতেই চোখে ভাসে সাতরঙা রংধনু। ভেসে ওঠে রঙিন পোশাক আর আলপনার বর্ণময় ছোঁয়া। শিল্পীগোষ্ঠীর রংতুলির কোমল স্পর্শে রাস্তায়-দেয়ালে চিত্রিত হয় বাঙালির নিজস্ব  প্রকৃতি; গেড়ুয়া পোশাকি অলীক কল্পিত ‘বাউল’ একতারা হাতে  কিংবা ঢোলকের বাদ্য হাতে উত্সবমুখর ছবি। ধুম লেগে যায় শহরের দোকানগুলোতে কেনাকাটার। পছন্দের কাপড় কেনার জন্য পরে প্রতিযোগিতার উপচে ওঠা ভিড়। ছোটছোট ছেলেমেয়েদের মুখে শিল্পীর অঙ্কিত ‘শুভ নববর্ষেই’ বলে দেয় বৈশাখ এসে গেছে।

‘মাছে ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটির প্রতিও আমরা যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। রীতিমতো পহেলা বৈশাখ শুরু হওয়ার আগেই মাছের বাজারে থাকে চড়া দাম। দাম যতোই হোক না কেন তবুও সংস্কৃতি রক্ষার্থে পিছপা হই না আমরা। সারাবছর গরম ভাত খাওয়ার অভ্যাস থাকলেও এই দিনটিতে পূর্বের ঐতিহ্যে পানতা খাওয়ার ঝোঁক এখনো আছে।

পহেলা বৈশাখের প্রাচীন ইতিহাস যেমন উত্সবমুখরিত তেমনি বৈশাখের কালো ঝড়ের মতো এর পিছে শাসক শ্রেণির শোষণের জলছাপও কম নেই। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সার্বজনীন উত্সবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ ঋতুধর্মী উত্সব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাত্পর্য ছিল কৃষিকাজ। কারণ প্রযুক্তির প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হতো।

ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতো। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য হতো। সময়ে খাজনা দিতে না পারলে শুরু হতো নানান অত্যাচার-নিপীড়ন। অনেক প্রান্তিক কৃষক তাদের আবাদি জমির শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে বসতো খাজনা চুকাতে গিয়ে। পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাট আকবর কৃষকদের সুবিধার্থে বাংলা সনের পরিবর্তন করেন।

আমরা হয়তোবা মুঘল আমলে ফিরে গিয়ে সে সকল অবহেলিত মানুষের জন্য আন্দোলনের জোয়ার গড়তে পারবো না। কিন্তু বর্তমান সমাজের যেসব সুবিধাবঞ্চিত মানুষ রয়েছে, তাদের জন্য কতোটুকুই বা ন্যায্যতার গান গাই? জিইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা এক কোটি ৫৭ লাখ, যা মোট জনগোষ্ঠীর ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এখনো রেলস্টেশনে, বাসস্টপে পথশিশুদের আর্তনাদ শুনতে পাওয়া যায়, দিনশেষে দিনমজুর, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ঘামঝরা পাওনা কতোটুকুই বা সময়মত পরিশোধ করি? বছরঘুরে মাঠে খাটা কৃষকটি ফসল বিক্রির ‘অর্থ’ কতোটুকুই বা হাসি ফোটাতে পারছে? প্রায়শই খবরের কাগজের এসব প্রশ্নগুলো যেন অসমাপ্ত গল্প রয়েই আছে!

নতুন বছরে ব্যবসায়ীমহল খোলে নতুন খাতা, পুরানো হিসেব-নিকেশ মেটাতে ব্যস্ত। আকাঙ্ক্ষা করে পদোন্নতির, শপথ করে ভালো কিছু করে নতুন দিগন্তে পথ চলতে। ঠিক তেমনি করে আমরা প্রত্যেকে এই সমাজটাকে নিজের মতো করে গড়তে পারি। নিজ অবস্থান থেকে যতোটুকু পারি সাহায্যের হাত বাড়াতে। শুধুমাত্র দরকার একটুখানি মানসিকতা পরিবর্তনের। সমাজে কতিপয় এখনো অনেক মানুষ আছে যাদের ইলিশের অভাব নেই। আছে তিনবেলা ভাতের অভাব। চিকিত্সার অভাবে অনেক সুবিধাবঞ্চিত মানুষ মৃত্যুমুখে। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে যারা বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছে এখনো। আমাদের সামান্য ভাবনায় পারে স্টেশনে রক্তমাংসে গড়া ছেঁড়া জামা পরিহিত শিশুটির অমলিন হাসি রাঙাতে।

হয়তোবা অনেকের ইচ্ছে থাকলেও ওই সকল মানুষগুলোর জন্য কিছু করে উঠতে পারে না অর্থাভাবে। তবে একটু বিকল্প খুঁজলেই পাওয়া যায় সুখের অনুসন্ধান। হতে পারে বৈশাখের বাজেটের সামান্য পাশের বাসার পথ চেয়ে থাকা মানুষটির একটি জামা কেনার জন্য অথবা নিজের খাবারটুকু ভাগাভাগি করে নেওয়ার মাঝে কিংবা পকেট খরচের কিছু দিয়ে কোনো এক পথশিশুর পেট পুড়িয়ে খাইয়ে দিতে। কারোর মুখের হাসি ফোটানোর চাইতে কিই বা বেশি হতে পারে? সত্ ইচ্ছা আমাদের পুরো সমাজটাকে সুখী করতে পারে। হাসাতে পারে পুরো বাংলাদেশকে। চলুন না নববর্ষের এই দিনে শপথ করি নতুন এক ‘দিগন্ত’ রচনার!

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া