বাংলাদেশেও ঝড় তুলছে ‘#মি টু’ আন্দোলন

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৮, ২২:৫০

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও রীতিমতো জোরালো ঝড় তুলেছে নারীর যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ‘#মিটু’ আন্দোলন। পুরুষদের হাতে যৌন নিপীড়নে শিকার হয়ে বিভিন্ন কারণে যেসব নারী এতদিন চুপ করে ছিলেন তারা এখন মুখ খুলছেন সে সব নিপীড়ক ও তাদের অপকীর্তির বিরুদ্ধে। এ অভূতপূর্ব আন্দোলন সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছে সুশীল সমাজ। নারী তার বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায় জনসমক্ষে প্রকাশ করলে অভিযুক্তকেই প্রমাণ করতে হচ্ছে যে তিনি দোষী নন।

সমাজের বিশিষ্টজনরা বলছেন, দেশে যৌন সন্ত্রাস উত্খাতের যে আন্দোলন শুরু হয়েছে তা ধরে রাখতে হবে। ইতোমধ্যেই নারীদের দিকে খারাপ দৃষ্টি নিয়ে তাকানো পুরুষরা ভয় পেতে শুরু করেছে। অনেক আগে করা যৌন নিপীড়নের স্মৃতি মনে করে অনেকেই আতঙ্কে আছেন কখন না সেই পুরনো কাসুন্দি আবার সামনে এনে তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেন দেন নির্যাতিতা।

এ আন্দোলনের সমর্থকরা বলছেন, এটা অপরাধীকে জেল বা ফাঁসি দেয়ার আন্দোলন নয়। এটা অপরাধীর মুখোশ খুলে দেয়ার আন্দোলন। সম্প্রতি ‘#মিটু’তে অভিযোগের কারণে ভারতের কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এমজে আকবর পদত্যাগ করেছেন। বেশ কয়েকজন নারী তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। বলিউডের স্বনামধন্য অভিনেতা নানা পাটেকারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন অভিনেত্রী তনুশ্রী। এর পথ ধরে বাংলাদেশি প্রিয়তি, সিমন্তিনী, আলফাসহ বেশ ক’জন সাহসী তরুণী তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির কথা ফেসবুকে ‘#মিটু’ হ্যাশট্যাগ হিসেবে প্রকাশ করেছেন।  

নারী নেত্রীরা বলছেন, এ একুশ শতকে এসেও যৌন হয়রানি থেকে রেহাই মিলছে  না। সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে এটা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই অত্যন্ত গ্ল­ানিকর। উপরন্তু নারীকেই যৌন হয়রানির জন্য দোষারোপ করা হয় এবং সামাজিক বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয়। এটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এ আন্দোলন যৌন নিপীড়কদের কিছুটা হলেও যদি ভয়ের মধ্যে রাখতে পারে তবুও এটি স্বার্থক।

এ বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘ ২৫ নভেম্বরকে নারীর প্রতি সহিংসতা অবসানে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। আজ থেকে এ প্রচারাভিযান শুরু হবে। এ বছর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ হয়েছে— ‘ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’। সেখানে বিশেষ গুরুত্ব পাবে ‘#মিটু’ আন্দোলন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকেই আন্দোলন চলছে। কিন্তু এখন ‘মিটু’ আন্দোলনের শক্তিশালী  রূপ দেখতে পাচ্ছি। নারীদের যারা ভোগ্যপণ্য ভাবেন, তাদের বিরুদ্ধে এ আন্দোলন। মেয়েরা সাহস করে তাদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের কথা বলছে। নিজেই অভিযুক্তের নাম প্রকাশ করছে। এটি নারীর যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে যুগান্তকারী সফলতা।

আইন ও সালিশ কেন্দে র নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেন, ন্যায় বিচারকে যেন প্রভাবিত না করতে পারে, সেজন্য তদন্ত চলাকালীন সময়ে অভিযুক্তকে তার দায়িত্ব থেকে বিরত রাখতে হবে। মানবিক দৃষ্টিকোণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাবোধ থেকে ওই প্রতিষ্ঠান এ পদক্ষেপ নিতে পারে। সিনিয়র আইনজীবী সালমা আলী বলেন, প্রচলিত আইনেই এ সব অভিযোগের প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। অন্যদিকে, অপরাধ করে তা স্বীকার করার সংস্কৃতি আমরা এখনো তৈরি করতে পারিনি। কাজেই এটা আশা করা খুব কঠিন যে, ক্ষমতাধর পুরুষরা খুব সহজেই অপরাধ স্বীকার করবেন ও প্রকাশ্যে ক্ষমতা চইবেন। সুতরাং আমাদের এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে যাতে তারা সংশোধন হন, নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং অনুতপ্ত হয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাবেরী গায়েন বলেন, নিপীড়করা ভয় পাচ্ছে বলেই আন্দোলন থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দে র সভাপতি নাসিমুল আরা হক মিনু বলেন, মেয়েরা মুখ খোলায় পুরুষদের হূদকম্পন শুরু হয়ে গেছে।