বৈশাখ বাঙালির জীবনে শুধু ক্যালেন্ডারের পৃষ্ঠায় চিহ্নিত একটি দিন মাত্র নয়। এই দিনের সার্বিক আয়োজন বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনায় বিমূর্ত আলো। পথ চলার সহায়ক শক্তি। এই শক্তিকে অবদমন করার চেষ্টা করেছিল পাকিস্তান সরকার। পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন নিষিদ্ধ করেছিল। সরকারি ছুটি বাতিল করেছিল। বাঙালির অমিত শক্তির সামনে সেই আবদমন ধোপে টেকেনি। বাঙালির স্বাধীনতা অর্জন তার অমিত শক্তির বিশেষ দিক। এই দিক বাঙালির সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সীমান্ত অতিক্রম করেছে। বৃহত্তর সামাজিক পাটাতনের পরিসর বাড়িয়েছে। সৃষ্টি করেছে উদ্যম ও ব্যাপ্তিতে জাতিসত্তার বলয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাঙালিদের দ্বারা আয়োজিত বৈশাখী উত্সব আজ নিজেদের পরিচয়ে উজ্জ্বল উদ্ধার।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা। অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ বৈশাখ, তোমার চেয়ে আর কে বেশি জানে যে এ দুটো পঙিক্ত একজন কবির শুধু ঋতুবন্দনা নয়, কবি জীবনের কল্যাণে প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা করেছেন। বছর ধরে জমে ওঠা গ্লানি ও জীর্ণতাকে দূর করে ধরণীকে শুচি করার কথা বলেছেন। সারা বছরের আবর্জনা দূর হয়ে যাওয়ার মন্ত্র উচ্চারণ করেছেন। এ মন্ত্র ধূলিমলিন জরাগ্রস্ত পৃথিবীর চেতনা, যে বোধ জীবনের অবমাননা ঘটায়, তাদের দূর করে জীবনের দর্শনিক সুন্দরকে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন কবিগুরু। এ সত্য মঙ্গলের সাধনার গভীর বোধটি বাংলা নববর্ষে সব বাঙালির ভেতরে থাকুক—এ আহ্বান ধ্বনিত হয় এ দিনকে কেন্দ্র করে। হে বৈশাখ, আমরা তোমার দিনের শুরুর যাত্রাকে স্বাগত জানাই। তুমি আমাদের জীবনে নববর্ষের সূচনা কর।
সেজন্য আমরা সমবেত কণ্ঠে বলতে চাই, নববর্ষ একটি নতুন, অন্যরকম সূর্যোদয় উদ্ভাসিত করো বাংলাদেশের মানুষের জীবনে। আমরা নতুন আলোয় দেশটাকে দেখতে চাই। এখনো অনেক জঞ্জালে ভরে আছে এদেশের মানুষের জীবন। আমরা নতুন সূর্যোদয়ের দিকে তাকিয়ে বলতে চাই, এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।
আমরা তোমাকে চাই বৈশাখ। তোমার রুদ্র বৈশাখী জরাজীর্ণ পাতা উড়িয়ে নেওয়ার অমিত শক্তি, শান্ত-স্নিগ্ধ তারাভরা আকাশ, বৃষ্টির অপরূপ ছোঁয়া। দহন ও স্বস্তির সমন্বয়ে আমরা ভরে তুলতে চাই জীবনের বিশাল ক্যানভাস।
তোমার কাছে প্রার্থনা বৈশাখ, রংধনুর সাত রং দিয়ে একটি ফুল বানিয়ে দাও আমাদের। আমরা এদেশের জন্য জীবনদানকারী লাখো শহীদের স্মরণে ভরে দেই স্মৃতিসৌধ, দেশজুড়ে গড়ে ওঠা স্মৃতিস্তম্ভ ও গণকবরগুলো। আমরা শহীদের পবিত্র আত্মাকে বলতে চাই, আমাদের হূদয়ের সবক’টি জানালা তাদের জন্য খোলা আছে। ফুলের রঙে ভরে উঠুক দিগন্তরেখা পর্যন্ত টানা স্বদেশের সীমানা। সৌরভে ভরে উঠুক প্রতিটি মানুষের হূদয় এবং প্রায় ষোল কোটি মানুষ কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণে রাখুক শহীদদের। এই স্মরণ যেন কোনোদিনের বেড়াজালে বন্দি না থাকে। বৈশাখ, দেবে কি সাতরঙের একটি ফুল?
বৈশাখ, যুদ্ধের সময়ে যেসব বীর নারী পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নির্যাতিত হয়ে স্বাধীনতার মতো মহান গৌরবকে সত্য করে তুলেছিলেন আমাদের জীবনে, তাঁদের আমরা দিনের আলোয় স্নাত করতে চাই। তাঁদের আমরা দেশের প্রতিটি জনপদে নিয়ে যেতে চাই। রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে দিনমজুর মানুষটিও বলুক, আপনাদের কোনো লজ্জা নেই। সব লজ্জা পুরো জাতির, যারা আপনাদের যোগ্য মর্যাদা দেয়নি। আপনারা তাদের ক্ষমা করুন। বৈশাখ, তাঁদের কাছে আমাদের অকৃতজ্ঞতার দায় শোধ করার চেতনাকে রুদ্র তাপে প্রজ্বলিত করে দাও। শুধু মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণার মধ্য দিয়ে তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন যেন শেষ হয়ে না যায়। তাঁদের ধৈর্য, সাহস, তাঁদের ত্যাগ, স্বাধীনতার জন্য তাঁদের জীবন-মরণের স্বপ্ন যেন এই দেশের প্রজন্মের সামনে আলোর প্রদীপ হয়ে জ্বলে।
প্রিয় বৈশাখের কাছে প্রার্থনা, বৈশাখ, আমাদের স্বর্ণশস্যপ্রসবিণী পলি মাটি মাখানো নলখাগড়ার কলম দাও। আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম শস্যদানার অক্ষরে লিখে রাখি। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করুক সেই নাম। ইতিহাস বিকৃতির চক্রান্ত যেন সে নাম ছুঁতে না পারে। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র মুছে দিতে চায় ইতিহাসের জ্বলজ্বলে পৃষ্ঠা। ইতিহাসের খেরো খাতায় নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা করে। বৈশাখ, ‘তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে’।
বৈশাখ, বাঙালিকে একাত্তরের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ করে দাও। বাঙালি যেন বলতে পারে, হূদয় আমার, ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে। বৈশাখী ঝড় অনৈক্যের জায়গাটিকে উত্খাত করে ঐক্যের জায়গাটি সমান করে দিক। মানুষ হিসেবে বাঙালির শুভবুদ্ধি একাত্তরের চেতনার মতো দীপ্ত হয়ে উঠুক। স্বদেশ যেন বাঙালির চেতনার সবটুকু জায়গায় অমলিন থাকে, যেন সে বোধে কোনো ফুটো তৈরি না হয়। যেন ব্ল্যাক হোলের মতো সে ফুটো স্বদেশকে গ্রাস না করে। বৈশাখ, বড় মিনতি তোমার কাছে। তুমিই তো পারো বলতে, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা।’ জাতির জীবনে জমে যাওয়া আবর্জনা দূর করতে বাঙালিকে রুখে দাঁড়ানোর জন্য তুমি বিপুল শক্তি দাও।
আবার সেই আহ্বান, এসো, এসো হে বৈশাখ। তোমার নতুন প্রাণের উজ্জীবনী শক্তিতে আমরা পাহাড়প্রমাণ সমস্যাকে দূর করব। তুমি যদি নতুন বছর নিয়ে আসতে পারো, তাহলে আমরাও বছরের রূপবৈচিত্র্যকে ভিন্ন করতে পারব। আমাদের আশাবাদী সংগীতে বাজবে নবপ্রাণের গান। আমরা বলব, ‘বৈশাখ, হে মৌন তাপস... হঠাত্ তোমার কণ্ঠে এ যে আমার ভাষা উঠল বেজে, দিল তরুণ শ্যামল রূপে করুণ সুধা ঢেলে।’ সমাজজুড়ে মূল্যবোধের অবক্ষয় গ্রাস করেছে নানা দিক। উত্সবের আনন্দ খর্ব করছে অপশক্তি। নিগৃহীত করছে নারীদের। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা উত্সবের সময়কে বেঁধে দিয়ে সাংস্কৃতিক চেতনা বিকাশকে খণ্ডিত করছে। এ আমাদের কাম্য নয়।
আমাদের প্রার্থনায় আশার বাদ্য বাজাও, বৈশাখ। আমাদের অমিত শক্তিকে অভিনন্দিত করো।
