অব্যাহত প্রশ্ন ফাঁসে ২০ লাখ শিক্ষার্থীর উদ্বেগ

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৩:৩০

অব্যাহত প্রশ্নফাঁসের মুখে কমবেশি ২০ লাখ ৩১ হাজার এসএসসি পরীক্ষার্থীর মধ্যে নানামুখী শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি অভিভাবকরাও এ নিয়ে দারুণভাবে উদ্বিগ্ন। প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে কিনা এবং এ বিষয়ে মতামত দিতে গঠিত ১১ সদস্যের প্রশাসনিক কমিটি কাজ করছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ  আগেই বলেছিলেন প্রশ্ন ফাঁস হলে পরীক্ষা বাতিল করা হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার শিক্ষা সচিব সোহরাব হোসাইন সাফ জানিয়েছেন, প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রশ্ন ফাঁসের অন্যতম কারণ হিসাবে এমসিকিউ পদ্ধতিকে অনেকাংশে দায়ী করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে পরীক্ষা পদ্ধতি বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

প্রসঙ্গত, চলমান এসএসসি পরীক্ষায় ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত প্রতিটি বিষয়ে পরীক্ষা শুরুর আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাওয়া গেছে। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিলি করা প্রশ্নপত্রের সঙ্গে ওই প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল পাওয়া গেছে। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার রসায়ন পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হয়।

এসব পরীক্ষা বাতিল করা হবে কিনা, জানতে চাইলে শিক্ষা সচিব বলেন, এ বিষয়ে কমিটি কাজ করছে। তারা সেটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবেন, কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, কত শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। তা বিবেচনায় এনে তারা একটা সুপারিশ করবেন। সুপারিশ সরকার বিবেচনা করে দেখবে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের পর থেকে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় অন্তত ৮০টি বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।  ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতিবেদন (২০১৫ সাল) অনুযায়ী, চার বছরে বিভিন্ন পরীক্ষায় ৬৩টি বিষয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। গত ডিসেম্বরে যুক্ত হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। এ কারণে তিন শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়।

১৯৯২ সাল থেকে এমসিকিউ : বিএনপি সরকারের মেয়াদে ১৯৯২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় প্রতি বিষয়ে চালু হয় ৫০ নম্বরের এমসিকিউ বা বহু নির্বাচনী প্রশ্ন, বাকি ৫০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা। ৫০ নম্বরের এমসিকিউ উত্তর দিতে প্রতি বিষয়ে ৫০০টি এমসিকিউ প্রশ্ন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। ৫০ নম্বরের উত্তর দিতে শিক্ষার্থীরা ৫০০ এমসিকিউ মুখস্থ করে পরীক্ষায় বসতো। তখন এমসিকিউ ও রচনামূলক পরীক্ষা মিলে ৩৩ নম্বর পেলেই পাস করত পরীক্ষার্থী।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে নির্ধারিত ৫০০ নম্বরের এমসিকিউ তুলে দেয়। গোটা বই থেকে এমসিকিউ নির্ধারণ করে দেওয়া হয় এই সময়। পরে এমসিকিউর পূর্ণ নম্বর কমিয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়। এমসিকিউ পরীক্ষা নিয়ে নানামুখী সমালোচনা শুরু হয়।

গত বছর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান শিক্ষককে যে কোনো উপায়ে রাজি করিয়ে তাদের সব ছাত্রছাত্রী যেন ন্যূনতম ৩০ মার্কস পেতে পারেন সেই ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। একজনকে বলে দিচ্ছেন, তিনি আবার পাস করিয়ে দিচ্ছেন। এটা অর্থের বিনিময়ে হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয়ের কাছে রিপোর্ট আসছে। ফলে কমানোর সিদ্ধান্ত হয় এমসিকিউর নম্বর। গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় এমসিকিউ প্রশ্ন ৩০ শতাংশ করা হয়।

২০১৬ সালের ২৭ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। তাতে  শিক্ষাবিদরা এমসিকিউ পুরোপুরি তুলে দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছিলেন, এমসিকিউ কমিয়ে ১৫ নম্বরে নামিয়ে আনা উচিত। অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছিলেন, এমসিকিউ পুরোপুরি তুলে দেওয়া উচিত। ব্যবহারিকেও কোনো পরীক্ষা হয় না। ২৫ নম্বর এমনিতেই দিয়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়টাও ভাবা জরুরি।

বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিতে পাবলিক পরীক্ষায় দুটি ভাগ রয়েছে। এর মধ্যে এমসিকিউতে ৩০ নম্বর ও রচনামূলক পরীক্ষায় ৭০ নম্বর। আগামী বছর থেকে এমসিকিউ পরীক্ষা বাতিল করা হবে এমন সিদ্ধান্ত রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। প্রশ্ন ফাঁসের পরও ফাঁসের কারণ ও এর সাথে জড়িতদের খুজে বের বের করতে না পারা,  প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে নানামুখী আলোচনা সমালোচনা, হাইকোর্ট ও শিক্ষামন্ত্রণালয়ের পৃথক কমিটি গঠন, গ্রেফতারের ঘটনা - সব মিলিয়ে স্বস্তিতে নেই ২০ লাখ পরীক্ষার্থী।

গতকালই হাইকোর্ট একটি বিচারবিভাগীয়, আরেকটি প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তারা প্রশ্ন ফাঁসের কারণ ও প্রতিরোধে সুপারিশ প্রনয়ন করবেন। ৩০ দিনের মধ্যে কমিটি হাইকোর্টে প্রতিবেদন জমা দেবে। এর আগে ৪ ফেব্রুয়ারি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে কিনা তা যাচাই-বাছাই করে দেখতে পরীক্ষা মূল্যায়ন কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রনালয়।

একের পর এক প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা গণমাধ্যমে সচিত্র প্রকাশিত হতে থাকলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠন করে। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ পান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। এর মধ্যে ফেসবুক বন্ধ, ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে আনাসহ নানামুখী প্রস্তাবও দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু ফেসবুক বন্ধের প্রস্তাব নাকচ করে দেয় ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী। আর সমালোচনার মুখে ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রীর বক্তব্য, ইন্টারনেট প্রশ্ন ফাঁস করে না।

স্বরাষ্ট্র এবং ডাক ও টেলিযোগযোগ মন্ত্রণালয়ও প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে কোন সুরাহা করতে পারেনি। কেবল দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে।

প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন শিক্ষাসচিব সোহরাব হোসাইন। তিনি বলেন, বর্তমান পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে প্রশ্ন ফাঁস রোধ সম্ভব নয়। তাই আমাদের নতুন এমন কোনো প্রক্রিয়ায় যেতে হবে যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুযোগ থাকবে না। আমি চাই আগামী বছর থেকে যে পরীক্ষা হবে সেই পরীক্ষা যাতে কোনো ধরনের অভিযোগ ছাড়া হতে পারে সে রকম একটা প্রক্রিয়া। আমরা সবাইকে নিয়ে সমাধান বের করতে চাই, সে পথে আমরা অনেক দূর এগিয়েছিও।

তিনি বলেন, এমসিকিউ  অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। তবে আমাদের দেশের  প্রেক্ষাপটে তা কতটুকু ভালো উদ্যোগ সে বিষয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে। এই পদ্ধতিটি খুবই ঝামেলা করছে। এ বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আমি মনে করি, প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে এমসিকিউ অনেকাংশে দায়ী।

সচিব বলেন, ৩০ হাজার কর্মকর্তা-শিক্ষক, সবার মধ্যে দু’একজন হয়তো খারাপ মানুষ আছে, হয়ত ১০ জন হতে পারে। আমরা প্রত্যেকেই মানসিক কষ্টে আছি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, এখন প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার পর ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তেই তা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। যদি ইন্টারনেট না থাকত তবে ফাঁস হলেও সেটি এতবড় সর্বনাশা হতো না। সেটি সীমিত থাকতো, হয়তো কেউ জানতেই পারতো না।

ইত্তেফাক/নূহু