প্রাণিবিজ্ঞানের একটি অন্যতম শাখা হল হারপেটোলজি। যেখানে গবেষণা ও আলোচনা করা হয় উভচর এবং সরিসৃপ প্রাণীদের নিয়ে।
বাংলাদেশের যে কজন তরুন হারপেটোলজিস্ট তাদের গবেষণা কর্মের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করছেন তাদের অন্যতম হলেন কে এম মিজানুর রহমান। বর্তমানে তিনি রাশিয়ার কাজান (ভলগা রিজিয়ন) ফেডারেল ইউনিভার্সিটির বায়োইকোলজি, হাইজিন এন্ড পাবলিক হেলথ বিভাগের অধীনে পিএইচডি অধ্যয়নরত।
গবেষণার এত বিষয় থাকতে উভচর এবং সরিসৃপ প্রাণীদের নিয়ে গবেষণা কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর প্রতি ছোট বেলা থেকে স্বভাবজাত ভালবাসা কাজ করেছে। তবে গবেষণার বিষয় বস্তু হিসেবে বন্যপ্রানী বেছে নেয়ার পিছনে মূল ভুমিকা পালন করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ। ২০০৪ সালে যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হই তখন থেকেই শিক্ষক ও গবেষণা গুরু হিসেবে পেয়েছি দেশের সব প্রথিতযশা বন্যপ্রাণী গবেষকদের সান্নিধ্য। ৪র্থ বর্ষে এসে খ্যাতনামা প্রানীবিদ প্রফেসর ড. মনিরুল এইচ খানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে কাজ করার সুযোগ হয় বাংলাদেশের উভচর এবং সরিসৃপপ্রাণীদের বাস্তুসংস্থান নিয়ে কাজ করার।
তিনি বলেন, মূলত মনিরুল এইচ খানের অনুপ্রেরনায় উভচর এবং সরিসৃপ প্রাণীদের নিয়ে কাজ করতে অনুপ্রাণিত হন তিনি। কারন ওই সময় অন্য সকল বন্যপ্রাণী নিয়ে গবেষকদের আগ্রহ এতটাই বেশি ছিল যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গবেষণা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ প্রকল্পে উভচর এবং সরিসৃপ শ্রেণীর প্রাণীরা অবহেলিতই থেকে যেত।
এভাবেই শুরু। এরপর ফিল্ড ওয়ার্কের জন্য ঘুরে বেরিয়েছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন চিরহরিৎ ও পত্রঝরা বনাঞ্চলে। গবেষণার পাশাপাশি ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন বাংলাদেশের বন বিভাগের অধীনে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ প্রকল্পে। তারপর অনার্স শেষে মাস্টার্সের জন্য বেছে নেন ওয়াইল্ড লাইফ ইকোলজি, ম্যানেজমেন্ট এন্ড কনজারভেশন বায়োলজি বিভাগ এবং গবেষণা করেন বাংলাদেশের প্রকৃতিতে স্ক্যাভেঞ্জার হিসেবে গুই সাপের ভুমিকা নিয়ে।
মাস্টার্স শেষে ২ বছর কাজ করেছেন ইউএস-বাংলা এসেটসে প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট এক্সিকিউটিভ হিসেবে। কাজের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপের জন্য আবেদন করতে থাকেন। অবশেষে সুযোগ হয় ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ নিয়ে রাশিয়ার কাজান ফেডারেল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি গবেষক হিসেবে কাজ করার।
বর্তমানে প্রফেসর ডঃ ইলগিজার ইলিয়াজোভিচ রাহিমোভ এবং প্রফেসরডঃ মনুরুল এইচ খানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে কাজ করছেন পরিবর্তিত বাস্তুতন্ত্রের সাথে গুইসাপের পরিবেশগত অভিযোজন ও বাংলাদেশে তাদের সংরক্ষণ প্রকল্প নিয়ে।
এছাড়াও প্রকল্প বাস্তবায়নে এবং যে কোন প্রয়োজনে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করছেন ডেল্টা স্টেট ইউনিভার্সিটির বায়োলজিক্যাল সায়েন্স বিভাগের এসোসিয়েট প্রফেসর ও খ্যাতনামা হারপেটোলজিস্টডঃ এ এইচ এম আলী রেজা।
বন্যপ্রাণী নিয়ে এই তরুণ গবেষকের ইতিমধ্যে তার ১৭ টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। ব্রিটিশ হারপেটোলজিক্যাল সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত হারপেটোলজিক্যাল বুলেটিন, হারপেটোলজিক্যাল সোসাইটি অব স্পেন অ্যান্ড পর্তুগাল কর্তৃক প্রকাশিত ব্যাসিক অ্যান্ড আপ্ল্যাইড হারপেটোলজি এবং রাশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্স কর্তৃক প্রকাশিত রাশিয়ান জার্নাল অব হারপেটোলজি সহ আন্তর্জাতিক খ্যতি সম্পূর্ণ বিভিন্ন জার্নালে।
গবেষণার স্বীকৃতি স্বরূপ ইতিমধ্যে তিনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আই ইউ সি এন ও স্পিসিস সারভাইভাল কমিশনের মনিটর লিজার্ডস্পেশালিষ্ট গ্রপের ভ্যারানাস লিজার্ড স্পেশালিষ্ট হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। এছাড়াও তিনি বর্তমানে আই ইউ সি এন কর্তৃক মনিটর লিজার্ড এর রেড লিস্ট হালনাগাদ প্রকল্পে একজন এসেসর হিসেবে কাজ করছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পিএইচডি শেষে দেশে ফিরতে চান। ইচ্ছে আছে বাংলাদেশের কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের। শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রকৃতির সন্তান হিসেবে বাংলাদেশের প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও গবেষণায় কাজ করে যেতে চান নিরলসভাবে।
ইত্তেফাক/নূহু
