সীমান্তে ভারী অস্ত্রসহ মিয়ানমারের সেনারা

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৮, ২২:৩৫
কক্সবাজারের উখিয়া-নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তের নো-মেন্স ল্যান্ডের কাছাকাছি ওপারে গুলি বর্ষণের আওয়াজে কোনাপাড়ার শুন্যরেখায় অবস্থানরত সাড়ে ছয় হাজার রোহিঙ্গারা আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠায় নির্ঘুম রাত যাপন করেছে। আর মিয়ানমার যদি অতিরিক্ত সৈন্য না সরায় তাহলে আগামী দিনগুলোতেও নির্ঘুম রাত কাটার আশঙ্কা করছে রোহিঙ্গাদের। তবে সূত্রে জানা গেছে, তমব্রু সীমান্তের শক্তি বৃদ্ধি করতে শুক্রবার আরও চার ট্রাক সৈন্য নিয়ে এসেছে মিয়ানমার। এদিকে সীমান্তের ওপারে ভারী অস্ত্রসহ মিয়ানমারের অতিরিক্ত সেনা সমাবেশসহ সার্বিক বিষয়ে আলোচনার জন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি) শুক্রবার বিকাল তিনটায় ঘুমধুম সীমান্তে ফেন্ডশিপ ব্রিজের বাংলাদেশ অংশে পতাকা বৈঠকে বসে। 
 
পরে এক সংবাদ সম্মলনে ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঞ্জুরুল হাসান খান জানান, সীমান্তে নিজেদের অংশে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বাড়তি সেনা মোতায়েন করেছিল বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। একই কারণে তারা সীমান্ত এলাকায় ফাঁকা গুলি ছুড়েছিল বলেও দাবি করেছে। 
 
তিনি জানান, ভবিষ্যতে সীমান্ত এলাকায় ফাঁকা গুলির আগে বাংলাদেশকে অবহিত করবে জানায় ‘মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশ। তিনি আরও জানান, মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশ বিজিবির কাছে প্রশ্ন করে, সীমান্তে বাংলাদেশ কেন সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে। জবাবে আমরা জানাই, এটা মিয়ানমারকে টার্গেট করে করা হয়নি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যই আমরা এটা করেছি। 
 
মঞ্জুরুল হাসান খান জানান, ‘তমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের যে কোনও সময় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানিয়েছে মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশ। তিনি জানান, সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক আছে। শূন্যরেখায় থাকা রোহিঙ্গারাও ভালো আছে। পতাকা বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেন মঞ্জুরুল হাসান খান ও মিয়ানমারের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেন দেশটির মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশ বিজিপি-১ এর লেফটেন্যান্ট সোয়োজাই লিউ।
 
জানা যায়, (১ মার্চ) বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তুমব্রু সীমান্তের কোনা পাড়ার নো মেন্স ল্যান্ডের হঠাৎ করে অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ ঘটায় মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের দিকে ভারী অস্ত্রের পাশাপাশি হালকা অস্ত্র তাক করে রাখে বর্মী সেনারা। তবে সন্ধ্যার পর মিয়ানমার সেনারা দুইটি ফাঁকা গুলি বর্ষণের আওয়াজ করে আতঙ্কের চেষ্টা চালায়।
 
বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গারা জানান, বর্মী সেনারা রাতে মদ্যপান করে মাঝেমধ্যে কাঠবিড়ালিকে গুলি করে মেরে পুড়িয়ে খেতে অভ্যস্ত। তবে আজকের গুলির আওয়াজটি সীমান্ত আতঙ্ক রাখার জন্য আমাদের মনে হচ্ছে। তবে আমরাও আমাদের পরিবার পরিজনকে সমস্যা থেকে রক্ষা করতে বিজিবির পাশাপাশি পালাক্রমে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছি। 
 
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ‘মিয়ানমার সেনা বাহিনীর গুলিবর্ষণ শব্দ শুনে নো মেন্স ল্যান্ডের অবস্থানরত কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চলে আসেন। এদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু।
 
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম সরওয়ার কামাল জানান, সন্ধ্যার পর তুমব্রু সীমান্তের ওপারে কয়েক রাউন্ড গুলি বর্ষণের আওয়াজ শুনা গেছে। তবে আমাদের দেশকে লক্ষ্য করে নয়। হয়ত সীমান্ত আতঙ্ক রাখার জন্য ফাঁকা গুলি ছুড়া হয়েছে। গুলি বর্ষণে কোন রকম হতাহতে খবর পাওয়া যায়নি। বর্মী সৈন্যরাও আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠায় রয়েছে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। তবে আমাদের বিজিবি এই বিষয়ে সতর্কতায় টহল ও নজরদারি বাড়িয়েছে। এলাকাবাসীও দেশ রক্ষার্থে অতন্দ্রপ্রহরীর মত সহযোগিতা করে যাচ্ছে বলে তিনি আরও জানান।
 
শুক্রবার এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আর কোন ধরনের গুলিবর্ষণের আওয়াজ ও মাইকিং এর আওয়াজ পাওয়া যায়নি। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের মতো যে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিবি সম্পূর্ণরূপে সীমান্তে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব সৈন্য সমাবেশকে কেন্দ্র করে উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে বিজিবি টহল জোরদার ও নজরদারি বাড়িয়েছে।
 
প্রসঙ্গত, গত মাসের ২৪ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের উত্তপ্ত রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তুইতে সকালে তিনটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। এই তিনটি বোমার একটি বিস্ফোরিত হয় ক্ষমতাধর রাজ্য সচিব তিন মঙ সোইয়ের আবাসিক কম্পাউন্ডে। অপর দুটি বিস্ফোরিত হয় একটি আদালত ও ভূমি অফিসের কাছে। এতে আহত হয় এক পুলিশ সদস্য। আরো কয়েকটি ডিভাইস অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
এছাড়া গত বছরের আগস্ট মাসের শেষ দিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কয়েকটি পুলিশি চেকপোস্টে হামলার জের ধরে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দমন পীড়ন শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাত লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। 
 
এছাড়া প্রায় সাত হাজার রোহিঙ্গা তুমব্রু সীমান্তের শূন্য রেখায় আশ্রয় নিয়ে আছে। ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকেই তাদের নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার সকালে হঠাৎ তুমব্রু সীমান্তে শক্তি বৃদ্ধি করে মিয়ানমার। তারা বেশ কিছু সামরিক পিকআপ, ট্রাক ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শূন্য রেখা থেকে দেড়শ গজ ভেতরে অবস্থান নেয়। ফলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই বিজিবিও সতর্ক অবস্থান নেয়। সীমান্তে বিজিবিও তাদের জনবল বৃদ্ধি করে। এ ঘটনায় বিজিবির পক্ষ থেকে প্রতিবাদলিপি ও পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়।
 
ইত্তেফাক/এমআই