জাকিয়া বেগম
নুসরাত আমাদের কারো আদরের বোন, কারো আদরের মেয়ে। মানুষকে অন্যান্য প্রাণী বা সব কিছু থেকে আলাদা করা হয় তার বিচার-বুদ্ধির জন্য, বিবেকের জন্য। কিন্তু আমরা কি আমাদের বিচার, বুদ্ধি, বিবেক কাজে লাগাচ্ছি বা লাগাই? প্রতিদিন আমাদের কী পরিমাণ নৈতিক স্খলন, বিবেকের স্খলন হচ্ছে—তা আমরা ভেবে দেখি না।
আমরা আমাদের মানবীয় গুণাবলী বিসর্জন দিচ্ছি প্রতিনিয়ত, হারিয়ে ফেলছি নীতি-নৈতিকতা। লোপ পাচ্ছে আমাদের ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা। চারদিকে শুধু ব্যক্তিস্বার্থ ও জিঘাংসা মানুষকে অন্ধ করে ফেলছে। মানুষের মনে শুধু প্রতিহিংসাপরায়ণতা। আমাদের মানবিক মূল্যবোধ এতটাই নিম্নগামী হয়েছে যে একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। আমরা আমাদের ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য শিশুর মতো পবিত্র নিষ্পাপ প্রাণ কেড়ে নিতেও দ্বিধা করছি না। মনুষ্যত্ববোধ কতটা নিচে নামলে একজন সুস্থ মানুষকে হাত পা বেঁধে তার বাঁচার করুণ আকুতিকে উপেক্ষা করে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া যায়! একটা মানুষকে মেরে ফেলার প্রস্তুতি নিতে নিতেই এবং তার করুণ আকুতিতেই তো রাগ থেমে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটা হয় নাই। এ সকল নরপিপাসু হায়নাদের কাছ থেকে আজও আমরা সমাজটাকে মুক্ত করতে পারলাম না। তনু, রাফিয়া, নুসরাতের পর আগামীকালের শিকার আপনি-আমি বা আপনার-আমার কন্যাসন্তানটি নয় তো?
একটা সন্তান মায়ের গর্ভে আসার দিন থেকে তাকে নিয়ে পিতামাতার পরিকল্পনার শেষ থাকে না। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে লালন-পালন করার ক্ষেত্রে বাবা-মার কত যে শ্রম-কষ্ট মিশে থাকে, তা কারও অজানা নয়। একজন সন্তান শুধু তার বাবা মার নয়, একটা দেশের সম্পদ। আর সেই সম্পদকে যখন কোন নরপিপাসু হায়নাদের কুকর্ম-লালসা চরিতার্থ করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় জীবন দিতে হয় তখন তা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। যার চলে যায় সেই বোঝে হারানোর যন্ত্রণা কী। আমরা কেন মানবীয় গুণাবলী হারিয়ে ক্রমেই নিষ্ঠুর হয়ে উঠছি? আমরা যত শিক্ষিত হচ্ছি, আমাদের মধ্যে মানবতাবোধ যেখানে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা, সেখানে মানবতাবোধ কমছে, প্রতিনিয়ত লোপ পাচ্ছে আমাদের বিবেক। কিন্তু কেন? শিক্ষিত মানুষের মধ্যে মানবীয় গুণাবলী আরো বেশি থাকার কথা। শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে, তা কিন্তু এখন আর তেমন দেখা যায় না।
আজকাল প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হতে হয়, স্তম্ভিত হতে হয়। পত্রিকার পাতা ওল্টালেই দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। খবর পড়ে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। কেন একজন সন্তানের বিশেষ করে কন্যাসন্তানের পিতামাতাকে চলার পথে প্রতিটি ক্ষেত্রে টেনশনে থাকতে হবে? কার ভয়ে আমাদের এই টেনশন? এই উত্তর কারো অজানা নয়। মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা বিলীন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন, প্রেম-ভালোবাসা ও দয়া-মায়া ধীরে ধীরে নির্বাসিত হয়ে যাচ্ছে। তুচ্ছ কারণে মানুষ মানুষকে হত্যা করছে। সামান্য বিষয়ে খুন-খারাবি একটা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি আমাদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ থাকত তাহলে আমরা একে অপরের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতাম। কোনো শিশুকে লাথি মেরে সরিয়ে দিতাম না, কারো মা-বোনকে ধর্ষণ করতাম না। সব মৃত্যুই বেদনার, সব কষ্টই কষ্ট। তার পরও কোনো কোনো ঘটনা আছে বা কোনো মৃত্যু আছে, যা বুকের পাঁজর ভেঙে চুরমার করে দেয়। কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলা যায় না। আমাদের মধ্যে এমন পশুপ্রবৃত্তি বাড়ছে কেন? আমাদের সমাজে যে সামাজিক অস্থিরতা চলছে, এর শেষ কোথায়? আইনের শাসনের অভাবে মানুষের পশুপ্রবৃত্তি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু আইনি কাঠামো দিয়ে এ অবক্ষয় দূর করা যাবে না। এ জন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন এবং নাগরিক সমাজকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
একজন নারীকে কেন মরে গিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে সে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিল? নুসরাত তো তার প্রতি যৌন হয়রানির মামলা করেছিল, কিন্তু তখন এর বিরুদ্ধে যদি শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া হতো তাহলে আজ আর এই দিনটি দেখতে হতো না। নারীরা কি তাহলে মরে গিয়েই প্রমাণ করবে তার প্রতি যে অন্যায় আচরণ করা হয়েছিল? এখনো যদি আমরা রুখে না দাঁড়াই তাহলে কাল যে আপনার-আমার কারো মা, বোন, কন্যার পরিণতি যে নুসরাতের মতো হবে না—তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন নুসরাতের হত্যাকারীদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি দিতে। এখন আমরা সবাই যদি এক কাতারে এসে দাঁড়াই, তবেই এই ধরনের জঘন্য অপরাধের উপযুক্ত বিচার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
একটি সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমরা যদি মনোনিবেশ করতে চাই তাহলে সবার আগে আমাদের মনুষ্যত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। চলুন, আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াই, নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আমাদের সুকুমারবৃত্তিগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
n লেখক : পিএইচডি গবেষক, জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, এআইটি, থাইল্যান্ড
