গাছকে আমরা কতটুকু জানি?

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০১৯, ২২:১১

তাহমিনা সুলতানা যূথী

মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হলে কি হবে! আশ্চর্যজনক হলেও এটা সত্য যে, এই শ্রেষ্ঠ জীবই বেঁচে থাকার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। আমাদের চারপাশে তাকালে কতই না বিচিত্র রকমের উদ্ভিদ আমাদের দৃষ্টিগত হয়, যেগুলো থেকে আমরা প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার রসদ পাই। আসলে উদ্ভিদ হলো মানবের পরম বন্ধু। উদ্ভিদ শুধু মানুষকে দিতেই জানে, বিনিময়ে কোনো কিছু চায় না। অথচ মানুষ তার এই পরম বন্ধুর সম্পর্কে বড়োই বেখেয়াল। মানুষ উদ্ভিদ তথা বৃক্ষরাজি, গাছগাছালিকে বন্ধু হিসেবে তো গ্রহণ করেই না, বরং সর্বদা বৃক্ষের ক্ষতি সাধন করলেই যেন তারা বেঁচে যান। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। একবার মানুষের কথা ভাবুন, কেউ যদি কোনো কারণে কারো প্রতি কটূক্তি করে বা আঘাত করে ক্ষণকাল অপেক্ষা না করে মানুষ তার প্রতি প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠে কিন্তু বৃক্ষ? বৃক্ষকে হাজারো আঘাত করা হলেও সে কখনো বিমাতাসুলভ আচরণ করে না। আপনার যদি ইচ্ছে হয় গাছের একটি বাকল বা পাতা অনায়াসেই ছিঁড়তে পারবেন বিনিময়ে প্রতিশোধস্বরূপ গাছ কখনোই আপনার জন্য অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করবে না বা তার ছায়ার আশ্রয় থেকে আপনাকে বঞ্চিত করবে না উপরন্তু নিজের ভিতরে সঞ্চিত ঔষধি গুণাবলির মাধ্যমে আপনার, আমার, আমাদের জীবনকে বাঁচিয়ে তুলবে। আমাদের পরিবেশ রক্ষার জন্য উদ্ভিদ যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি অনেক মরণ ব্যাধির ওষুধও তৈরি হয় এই উদ্ভিদ থেকে। সত্যি বলতে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি উদ্ভিদের এমন অনেক ঔষধি গুণাবলি আছে যা আমাদের অনেকেরই অজানা। বর্তমানের ডিজিটাল যুগে আমরা এখন পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর। এই প্রযুক্তির যুগে কেউ এখন আর উদ্ভিদীয় চিকিত্সায় আস্থা পায় না। অথচ এই প্রযুক্তিনির্ভর ওষুধের চেয়ে গাছের ঔষধি গুণ কতটাই না কার্যকর আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াবিহীন। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা গাছের ঔষধি গুণাবলির উপর পুরো নির্ভরশীল ছিলেন। তাদের ভিতরে ছিল গাছসম্পর্কিত অগাধ জ্ঞান। বর্তমান প্রজন্ম ভেষজ গুণাবলি যেন ভুলতেই বসেছে। এমন কি আমি নিজেও উদ্ভিদীয় গুণাবলি সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানি না, তবে প্রতিনিয়ত জানার চেষ্টা অব্যাহত আছে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত আদৌ সেই জ্ঞান পৌঁছাতে পারবে কি না সন্দেহ। বর্তমানে অনেক উদ্ভিদবিজ্ঞানীরাই এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তাই তারা উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়ে ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ জাগানোর জন্য একটি বিশাল প্লাটফর্ম তৈরি করছেন। বর্তমানে হূদরোগ একটি উদ্বেগের বিষয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (২০০৩)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর ১৬.৭ মিলিয়ন মানুষ শুধু হূদরোগের ঝুঁকিতে মারা যায়। যেটির শতকরা হার ১৯৯০ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ২৮.৯% থেকে ৩৬.৩% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাবে। তাই বর্তমান বিশ্বে এটির নিরাময় অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

প্রতিটি উদ্ভিদই মানুষের জন্য খুবই দরকারি। যেমন বাসকের পাতা অ্যালকোহল, হাইপোটেন্সিভ, কার্ডিয়াক ডিপ্রেসেন্ট, ব্রনকোডায়াল্ট রোগে ব্যবহার হয় এবং ইহা কাশি, ব্রনকোডাইলেটর, হাইপোগ্লাইসেমিক প্রতিরোধ করে। এর মূল ও বাকল হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া,যক্ষ্মা রোধ করে। তেমনি বেল কোষ্ঠকাঠিন্য, আমাশয়, পৌষ্টিক নালির প্রদাহ, ডায়রিয়ায় কাজ করে। বেলের বাকল রক্তের চিনি কমায়, হূিপণ্ড ও পেটের ব্যথা নিরাময় করে। পেঁয়াজের রস ম্যালেরিয়া, বাত, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টরল কমানো, ব্যথা, স্কার্ভি, সারকুলার অ্যালোপেসিয়াতে এটি কাজ করে। রসুন কোলেস্টরল ও চিনির কমায়, রক্তচাপ কমায়, হূিপণ্ড ও স্ট্রোকের পরিমাণ কমায়। শুধু উপরিউক্ত উদ্ভিদগুলোই নয়, সকল ধরনের উদ্ভিদে এরকম অসংখ্য গুণ রয়েছে। উদ্ভিদ মানবের শ্রেষ্ঠ বন্ধু এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বর্তমান প্রজন্মের উচিত উদ্ভিদের গুণাবলি জানা এবং প্রয়োজনে বাস্তব জীবনে এর ব্যবহার করা।

n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়