রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
নাজমুল মৃধা
সকালের সূর্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ির কাঁটা যেমন চলতে থাকে তেমনি বাড়তে থাকে সূর্যের তাপশক্তি। এবারের বৈশাখ যেন মেঘ আর সূর্যের ইঁদুর-বিড়াল লুকোচুরি খেলা। সকাল থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশে ছিল কালো মেঘের আনাগোনা। তবে এদিন কালো মেঘের আড়াল ভেদ করে সূর্য ফিরে পেয়েছিল তার নিজস্ব প্রাণশক্তি। এ যেন অন্ধকার অথচ বিবর্ণ মেঘেঢাকা একটি বছরের অভিশাপ ভুলে নতুনভাবে পথচলার প্রাথমিক প্রয়াস। প্রচন্ড তাপে কাঠবিড়ালীগুলো খুঁজে নেয় সবুজ পাতার ছায়া, পরিষ্কার হয়ে আসা নীল আকাশের সৌন্দর্যকে আরও দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয় শূণ্যে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘ। তেমনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সবুজ ঘাসের সৌন্দর্য দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয় ছোট্ট সোনামনির নিটল পায়ের আনাগোনা, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ, কিশোর এবং মধ্যবয়সী নারী পুরুষের পরিধান করা বাহারি রঙের পোশাক।
সকাল থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়াও শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা সাধারণ সৌন্দর্যপ্রেমীরা উপভোগ করতে থাকে ক্যাম্পাসের নানা আয়োজন। পাঞ্জাবি আর শাড়ি যেন এই দিনটির প্রধান পোশাক। বয়স্কদের সঙ্গে সঙ্গে কমবয়সী ছেলেমেয়েরাও পাঞ্জাবি আর শাড়ি পড়ে আসে এদিন।
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের আয়োজনে চলে পান্তা-ইলিশের জমজমাট আয়োজন। টুকিটাকি চত্বর, আম চত্বর, স্নান চত্বর, বুদ্ধিজীবী চত্বর, স্বপ্ন চত্বর, চারুকলা অনুষদসহ বিভিন্ন খোলা জায়গায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল প্রদীপ্ত তারুণ্যের উত্সবে ভরা। নাচে-গানে ক্যাম্পাসের প্রতিটি জায়গা ছিল সাউন্ড বক্সের দখলে। কেউ কেউ আবার বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পোশাক পাঞ্জাবি-লুঙ্গি পরে ক্যাম্পাস শো-ডাউন দিয়েছে। ক্যাম্পাসের প্যারিস রোডে সবার আনাগোনা ফ্রান্সের সেই তালা ঝুলানো ভালবাসার সেতুটির কথাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়।
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ সকাল থেকেই নানা আয়োজনে র্যালি বের করে। তবে চারুকলা অনুষদ বরাবরের মতোই বিশাল আকারের মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় বিশেষ আকর্ষণ ছিল ঘোড়া, ময়ূর, হাতির বিশাল আকারের প্রতীক। এর মধ্যে ঘোড়া রাখার কারণ হলো দেশের দ্রুত উন্নয়নের পথিক হিসেবে। বাংলাদেশ সরকার যেভাবে দ্রুত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে ঘোড়ার দৌঁড়ের দ্রুততার সাথে তুলনা করে এটি রাখা হয়। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগ, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন গরুর গাড়িতে নতুন জামাই-বউ, পালকিতে নতুন বউ এভাবে নানা সাজে র্যালি বের করে যা ছিল দৃষ্টিনন্দন।
এদেশের তরুণরাসহ ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সারাবছর জুড়ে পাশ্চাত্য সভ্যতাকে ধারণ করে ভুলে যেতে বসেছিল নিজস্ব সংস্কৃতি। আর বছরের এই একটা দিনে তারা জানতে পারে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, জানতে পারে বাঙালী সত্তার শেকড়। জানতে পারে মোঘল সম্রাট আকবরের দেওয়া বাংলা নববর্ষের প্রাথমিক ইতিহাস। এভাবে অতীতের সমস্ত গ্লানি ধুয়ে মুছে গিয়ে ফিরে আসুক শান্তির বার্তা, উজ্জ্বীবিত হোক আবহমান গ্রাম-বাংলার প্রিয় বাঙালি মনন এবং সংস্কৃতি। সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হোক জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ।
