কিছুতেই যেন আগুনের আগ্রাসন হইতে মুক্তি মিলিতেছে না। কেবল গত দুইদিনেই রাজধানী ঢাকা ও সন্নিকটবর্তী গাজীপুরের পাঁচটি স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সময়োচিত ও সুদক্ষ ভূমিকার কারণে বড়ো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনা না ঘটিলেও জনমনে ইহার যে নেতিবাচক প্রভাব তাহা মোটেও সামান্য নহে। তন্মধ্যে রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বরে ১০ তলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে রবিবার বিকাল ৫টার দিকে। ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনিতে সক্ষম হয়। পরদিন বিকালেই মগবাজারে একটি বাড়ির গ্যারেজে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিটের এক ঘণ্টার চেষ্টায় সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ইহার আগে দুপুর আড়াইটার দিকে বকশিবাজারের চানাচুর গলিতে গ্যাসলাইনে আগুন লাগে বলিয়া ফায়ার সার্ভিসসূত্রে জানা যায়। রবিবারেই গাজীপুরে পৃথক দুইটি অগ্নিকাণ্ডে ১৫টি ঝুটের গোডাউন ও একটি স্পিনিং মিলের মালামাল পুড়িয়া যায়। গতকালও রাজধানীতে একটি সরকারি দপ্তরে শর্টসার্কিট হইতে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গিয়াছে। প্রসঙ্গত মনে রাখা আবশ্যক যে, চকবাজারের চুড়িহাট্টার আতঙ্ক কাটাইয়া উঠিবার আগেই বনানীর এফ আর টাওয়ার ও গুলশান মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। তাহারই ধারাবাহিকতায় যেন সংঘটিত হইয়া চলিয়াছে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড! সঙ্গত কারণেই এইসকল ঘটনা আতঙ্কের গণ্ডি ছাড়াইয়া যদি জনমনে কিছু সন্দেহ-সংশয়েরও জন্ম দেয় তাহাকে খুব একটা অস্বাভাবিকও বলা যাইবে না। সেইসঙ্গে অতীতের তিক্ত কিছু অভিজ্ঞতা তো আছেই। কথায় আছে ‘ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়’!
কাকতালীয়ভাবে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে বেশকিছু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিলেও এইগুলি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলিয়াই আমাদের বিশ্বাস। অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রেই দেখা গিয়াছে যে, এই সকল দুর্ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব, দুর্নীতি-অনিয়ম আর ভবনের মালিক ও বাসিন্দাদের চরম দায়িত্বহীনতাই দায়ী। সেই নিমতলী হইতে শুরু করিয়া আজতক সংঘটিত প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডই আমাদের জন্য অভিন্ন ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ কিছু সতর্কবার্তা বহন করিয়া আনিলেও কেহই তাহা হইতে কোনো প্রকার শিক্ষা গ্রহণ করিতেছেন না। তদারককারী কর্তৃপক্ষের অনিয়ম-দুর্নীতি ও গাফিলতি যেমন বন্ধ হইতেছে না, তেমনি বোধোদয় হইতেছে না ভুক্তভোগীদেরও। নিমতলীর প্রলয়ংকরী অগ্নিকাণ্ডের পর আশা করা হইয়াছিল যে, পুরাতন ঢাকার আবাসিক এলাকা হইতে রাসায়নিকের গুদামগুলি অপসারিত হইবে। সরকারি তত্পরতার পাশাপাশি বাড়ির মালিক এবং বাসিন্দারাও অন্তত নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই এই ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করিবেন; কিন্তু ‘সকলই গরল ভেল’! চকবাজারের চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ড আমাদের আবারও চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিল যে আমরা নিমতলী হইতে কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করি নাই। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই কথা প্রযোজ্য। অথচ সকলে নিজ নিজ দায়িত্ব ঠিকঠাকমতো পালন করিলে এই ধরনের দুর্ঘটনা অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব; কিন্তু অপ্রিয় হইলেও সত্য যে আমরা তাহা করি না। এই মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া অগ্নিদুর্ঘটনা কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার মতো ভয়াবহতা হইতে পরিত্রাণ সুদূরপরাহতই বলা চলে।
