আবুল কাসেম ভূঁইয়া
নদীমাতৃক আমাদের বাংলাদেশে প্রাকৃতিক এবং চাষাবাদের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উত্পন্ন হয়ে থাকে। সাম্প্রতিককালে মাছের ব্যাপক চাষাবাদ এবং পোনা মাছ নিধন বন্ধ করায় মাছের উত্পাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পৃথিবীতে মত্স্য উত্পাদনে বাংলাদেশের স্থান চতুর্থ। থাইল্যান্ড, ভারত, চীনের পরই বাংলাদেশের স্থান। আগামী ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান সবার শীর্ষে থাকবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের আবহাওয়া এবং অন্যান্য পরিবেশ মাছ চাষের জন্য অনুকূল হওয়ায় আদিকাল থেকেই এ দেশের মানুষ চাষ করে আসছেন। আমাদের দেশে রয়েছে অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল, ঝিল, দিঘি, পুকুর, জলাশয়, ঝরনা, লেক। এসব জায়গায় বিভিন্ন ধরনের মাছের চাষ করা হয়। এ সব মাছের মধ্যে রুই, কাতলা, মৃগেল, পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, শিং, কৈ, বোয়াল, পাবদা, চিতল, শোল, গজার, চিংড়িসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ। বর্তমান সময়ে মাছ চাষ লাভজনক হওয়ায় সবাই বাণিজ্যিকভিত্তিতে মাছ চাষ করছেন। দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান মাছ চাষে এগিয়ে এসেছেন। এখন আর সনাতন পদ্ধতিতে মাছের চাষ করা হয় না। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিকভিত্তিতে আধুনিক প্রযুক্তিতে মাছের চাষ করা হচ্ছে। যে কারণে মাছের উত্পাদন আগের তুলনায় বহুগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। মত্স্য চাষ প্রকল্পগুলোর জন্য দেশে অসংখ্য মত্স্য হ্যাচারি গড়ে উঠেছে। এসব হ্যাচারিগুলো উন্নতমানের মাছের পোনা উত্পন্ন করে মত্স্য প্রকল্পগুলোতে সরবরাহ করে থাকে। সারা দেশে ব্যক্তিগত পর্যায়ে পাঁচ শতাধিক মত্স্য হ্যাচারি রয়েছে। আমাদের দেশে বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিকভিত্তিতে মত্স্য চাষ হলেও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, বরিশাল, সাতক্ষীরা এলাকায় ব্যাপকভিত্তিতে মাছের চাষ করা হচ্ছে। মত্স্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী জানা যায়, সারা দেশে বর্তমানে তিন লাখ ৭১ হাজার ৩০৯ হেক্টর আয়তনের পুকুরে মাছের চাষ করা হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১০ সালে সারা দেশের পুকুরে জলাশয়ে মাছ উত্পাদিত হয়েছে ১৬ লাখ টন। বর্তমানে দেশে মাছের চাহিদা ৪২ থেকে ৪৬ লাখ টন। বর্তমানে উত্পাদিত হচ্ছে ৩৬ লাখ টন। প্রতিবছর মাছের উত্পাদন গড়ে দেড় লাখ টন করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৮-১৯ সালের মধ্যে আমাদের দেশ মত্স্য উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। পুকুর জলাশয় থেকে মোট উত্পাদিত মাছের ৫৫ দশমিক ১৫ শতাংশ, আর নদী, খাল, বিলের মত উন্মুক্ত জলাধার থেকে আসে ২৮ শতাংশ এবং দেশে দক্ষিণাঞ্চলের মত্স্য উত্পাদন কেন্দ্র থেকে আসে ১৭ শতাংশ। বর্তমানে সারা দেশের বিভিন্ন মত্স্য প্রকল্পের সঙ্গে এবং মত্স্য চাষের সঙ্গে প্রায় সাড়ে ১৩ লক্ষ লোক জড়িত আছেন। মত্স্য চাষের জন্য অধিক পুঁজির প্রয়োজন পড়ে না। স্বল্প পুঁজি দিয়ে অধিক লাভ করা যায় বিধায় আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ মত্স্য চাষের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। আমাদের দেশের প্রতিটি গ্রামে গেলে একই চিত্র দেখা যায়। দেশের শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকার তরুণ, যুবকদের মত্স্য চাষের ব্যাপারে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করে তাদের বিনা সুদে ঋণ প্রদান, জমি, জলাশয় লিজের ব্যবস্থা করে দিলে আমাদের দেশের মাছের উত্পাদন বহুগুন বৃদ্ধি পাবে। এ ব্যাপারে সরকারকে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। দেশে উত্পাদিত মাছের বাজারজাতকরণ এবং বিদেশে রপ্তানি সহজ করে দিলে মত্স্য ব্যবসায়ীরা আরো লাভ হতেন। আমাদের দেশে মত্স্য বিপ্লব ঘটানো কোনো কঠিন ব্যাপার নয়। দেশের মানুষ এবং সরকারের যৌথ উদ্যোগে সবই সম্ভব।
n লেখক :বীমা কর্মকর্তা
