অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খানকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরখাস্তসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছে ছাত্রলীগ। বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে ছাত্রলীগের নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি প্রদানের মাধ্যমে এসব দাবি জানান। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান দেশের বাইরে থাকায় স্মারকলিপি গ্রহণ করে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ।
তাদের তিন দফা দাবি হলো- অভিযুক্ত শিক্ষককে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরখাস্ত করা, আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা, অভিযুক্ত শিক্ষককে জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমতা চাইতে হবে।
স্মারকলিপি প্রদানের সময় আরও উপস্থিত ছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল, প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানী, নীল দলে আহ্বায়ক কবি মুহাম্মদ সামাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স।
এর আগে ছাত্রলীগ ২৭ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসা শিক্ষা অনুষদের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সেখানে তারা মোরশেদ হাসান খানের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন এবং ক্যাম্পাসে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।
ইতিহাস বিকৃতিকারীদের শাস্তি না হওয়ায় ইতিহাস বিকৃতি
ইতিহাসবিদরা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুসহ বিভিন্ন বিষয়ে বারংবার ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। কিন্তু সেসব ইতিহাস বিকৃতিকারীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় অপরাধীরা ইতিহাস বিকৃতিতে উৎসাহিত হচ্ছে।
গত ২৬ মার্চ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ‘জ্যোতির্ময় জিয়া’ শিরোনামে এক নিবন্ধ লিখেন অধ্যাপক মোরশেদ হাসান খান । তিনি লিখেন, ‘ আওয়ামী নেতাদের বেশিরভাগই তাদের পরিবার পরিজনসহ ভারতে চলে গেলেন, এ দেশবাসীকে মৃত্যু ফাঁদে ফেলে দিয়ে নেতৃত্বহীন অবস্থায়। যাকে ঘিরে এ দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখত সেই শেখ মুজিবুর রহমানও।’ স্বাধীনতার ডাক এসেছিল শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার পর, তার আগে নয়। আমার জানা মতে তিনি কোনো স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি।’ পরে অবশ্য তিনি লেখাটির জন্য ক্ষমা চান এবং লেখাটি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।
এর আগে ২০১৬ সালে ৩০ মে দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকায় ‘স্মৃতিময় জিয়া’ শিরোনামে এক লেখাতেও অধ্যাপক মোরশেদ হাসান খান বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অবমাননা করেছিলেন। এতে তিনি লিখেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাক-হানাদার বাহিনী যখন এ দেশের নিরীহ-ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্বিচারে গণহত্যা চালায় তখন আওয়ামী লীগ নেতারা তাদের পরিবার-পরিজনসহ ভারতে পালিয়ে যান। শেখ মুজিবুর রহমানও এ দেশবাসীকে মৃত্যুর ফাঁদে ফেলে দিয়ে পাক-হানাদার বাহিনীর কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেন।’
এছাড়া ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৫তম জন্মবার্ষিকীর স্মরণিকায় ইতিহাস বিকৃতি করা হয়। এই স্মরণিকায় ‘স্মৃতি অম্লান’ শিরোনামে একটি নিবন্ধে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে দেশের ‘প্রথম রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্মরণিকাটি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। স্মরণিকার সম্পাদক ও ওই নিবন্ধের লেখক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমানকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের উপ-পরিচালক করা হয়। এই বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দেয়া সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
২০০৯ সালে হাইকোর্ট ‘ জিয়া নয়, বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার ঘোষক’ বলে রায় দেয়। হাইকোর্টের রায়কে অবমাননা করে বারবার এমন ইতিহাস বিকৃতি করলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
এ বিষয়ে ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মেজবাহ কামাল বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণার মতো গৌরবোজ্জ্বল বিষয়কেও কলঙ্কিত করছে একটি বিশেষ শ্রেণি। এটা শুধু পরিত্যাজ্য নয়, ঘৃণ্য অপরাধও। ইতিহাস বিকৃতি যারা করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এর আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিকৃতি হয়েছে কিন্তু কোনো বিচার হয়নি। ফলে অপরাধীরা বারবার ছাড় পেয়ে যায়। ইতিহাস বিকৃতির ব্যাপারে আইন প্রণয়ন হওয়া দরকার।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নীল দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক কবি মুহাম্মদ সামাদ বলেন, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের কাছে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বলেছি। উপাচার্য দেশের বাইরে আছেন। তিনি আসলে হয়তো একটি পদক্ষেপ নিবেন।
এ বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, যারা বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতি করেছে ও বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করেছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন সংগ্রাম চলবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ বলেন, উপাচার্য বাইরে আছেন। দেশে আসলে ইতিহাস বিকৃতিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ইত্তেফাক/আরকেজি
