সেশনজট কমছেই না বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৮, ১৭:৫৭
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট লেগেই আছে। এই সেশনজটে আটকা পড়ে রয়েছে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর জীবন। এর জন্য শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও শিক্ষক সংকটকে দায়ী করছেন অনেকে। এভাবে চলতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়টি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন এ অঞ্চলের শিক্ষাবিদগণ।
 
পাঁচ বছরের শিক্ষাজীবন ৮-৯ বছরেও শেষ করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। এতে, অনেকের সরকারী চাকুরীর বয়সসীমা শেষ হবার উপক্রম হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ইংরেজী, বাংলা, ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা,পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, গণিত বিভাগসহ বেশ কয়েকটি বিভাগে দুই থেকে তিন বছরের সেশনজট রয়েছে। সেশনজটের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পরিবারে। শিক্ষার্থীরা জানায়, শিক্ষকরা চাইলেই ভয়াবহ সেশন জটের করালগ্রাস থেকে মুক্ত হতে পারে তারা। 
 
জানা যায়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দুইটি শিক্ষক সংগঠন রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ ও আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন নীল দল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫২ জন শিক্ষকের প্রায় প্রত্যেকেই প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে এ সংগঠনদুটির সাথে জড়িত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেয়া হলেও বঞ্চিত রয়েছেন আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের শিক্ষকরা।
 
ফলে, প্রশাসনিক পদ পাওয়াকে কেন্দ্র করে নীরব দ্বন্দ্ব চলছে সংগঠন দুটির মধ্যে। দল দুটির মধ্যে গোপনে রেষারেষি থাকলেও সম্প্রতি এই রেষারেষি প্রকাশ্যে চলে আসে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের আস্থাভাজন হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের বেশ কিছু শিক্ষক একাধিক প্রসাশনিক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশাসনিক কাজের চাপে নিয়মিত ক্লাস পরীক্ষা নিতে পারছে না তারা। 
 
ইংরেজি বিভাগের ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থী রক্তিম মিলন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শুধুমাত্র শিক্ষক সংকটের কারণেই সেশনজট হচ্ছে এটি দায়সারা কথা। মূলত শিক্ষকদের অভ্যান্তরীণ টানাপোড়ানই সেশনজটের মূল কারণ। সেশনজটের দায় শিক্ষকদের হলেও এর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবারকে।’
 
বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নোবেল শেখ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটের মূল কারণ শিক্ষক সংকট। কিন্তু কয়েকটি বিভাগে শিক্ষক সংকট থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকদের আন্তরিকতার কারণে সেশনজট একেবারেই নেই। একইভাবে যদি প্রতিটি বিভাগের শিক্ষকগণ আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেন তাহলে সেশনজট কমানো সম্ভব।’
 
এ বিষয়ে বেরোবি ছাত্রলীগের সভাপতি তুষার কিবরিয়া বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা খুব বেশী রাজনীতি সচেতন। তারা একাডেমিক বিষয়ে যতটা গুরুত্ব দেন তার চাইতে বেশী গুরুত্ব দেন রাজনীতিকে। মনে হয় তাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার প্রধান উদ্যেশ্য শিক্ষকতা করা নয়, রাজনীতি করা। শিক্ষক সংকট তো আছেই তারপরও যারা আছেন তাদের আন্তরিকতা থাকলে সেশনজটের এই ভয়াবহতা থাকত না।’ 
 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের টানাপোড়ানের কারণে শিক্ষার্থীদের ক্লাস পরীক্ষার উপর কোন প্রভাব পড়ে বলে আমি মনে করি না। মূলত শিক্ষকদের উপর অতিরিক্ত চাপের কারণেই সেশনজটের তৈরি হয়। তবে পর্যাপ্ত পরিমাণ শিক্ষক থাকলে খুব তাড়াতাড়ি সেশনজট দূর করা সম্ভব।’
 
এ ব্যাপারে উপাচার্য অধ্যাপক ডক্টর নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ’র সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সেশনজট কমানোর জন্য আমরা নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছি। ৬ মাসের মধ্যে যাতে একটি করে সেমিস্টার শেষ করা যায় সে ব্যাপারে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। কোন কোন বিভাগে ৬ মাসের একটি ক্লাস হয়েছে এ রকম দৃষ্টান্ত রয়েছে।’
 
শিক্ষকদের দলাদলির কারণে সেশনজট কিনা জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের রাজনীতি আছে, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই; এ রকম ভাববার কোন সুযোগ নেই। সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একাধিক দল আছে। সব শিক্ষকদের বিভিন্ন বিষয়ে একমত হতে হবে এমন কোন কথাও নেই। একটি বিষয়ে নানান পদ্ধতিতে, নানান দৃষ্টিকোন থেকে দেখবার সুযোগ আছে।’
 
ইত্তেফাক/কেআই