যেই লাউ সেই কদু

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০১৯, ২১:১৯

আরিফুল ইসলাম

আজকাল পত্রিকার পাতা খুললেই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। এ যেন নিত্যদিনের একেবারে সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জন্ম নিলে মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু একজন সুস্থ মানুষ বাড়ি থেকে বের হয়ে যদি সড়কে গাড়ি চাপায় মারা যায়, তা সহজে মেনে নেওয়া যায় না। সহজে মানতে না পারা বিষয়টিই এখন আমাদের দেশে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন উদ্দেশে সকালে বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু, দিন শেষে তারা সড়ক দুর্ঘটনা এড়িয়ে সুস্থ শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে কি-না, এ কথাটি একেবারে নিশ্চিত হয়ে বলাটা বাংলাদেশে এখন বেশ কঠিন।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে যে হারে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে চলছে, সেটা আসলেই সকলের জন্য উদ্বেগের বিষয়। আর এসব সড়ক দুর্ঘটনায় তরুণ শিক্ষার্থী ও কর্মক্ষম মানুষের প্রাণহানি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতির পথে অন্তরায়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সড়কে প্রাণ ঝরেছে ৪,৭৪১ জন শিক্ষার্থীর। এ সময় যত মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, এর ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী। গত বছর ২৯ জুলাই রাজধানী ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের বিমানবন্দর সড়কে বাস চাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর সারা দেশে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে। ঐ আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেসনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরি। গত ১৯ মার্চ তিনিও প্রগতি সরণিতে বাসের চাপায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারায়। পরে জানা যায়, আবরারকে চাপা দেওয়া সুপ্রভাত পরিবহনের ঐ বাসটির মূল চালক এ ঘটনার কিছুক্ষণ আগে গুলশানের শাহজাদপুর এলাকায় এক ছাত্রীকে চাপা দেওয়ায় পুলিশের হাতে আটক হন। আর আবরারকে চাপা দেওয়ার সময় বাসটি চালাচ্ছিলেন চালকের সহযোগী। যে শিক্ষার্থীরা জাতির ভবিষ্যত্। যারা একদিন দেশের হাল ধরবে। সড়ক দুর্ঘটনায় এভাবে তাদের অকাল মৃত্যু জাতির ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরূপ। কেবল শিক্ষার্থীই নয়, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তি প্রাণ হারাচ্ছে। আর কোনো পরিবারের কর্মক্ষম একজন নিহত হওয়া কয়েকজনের প্রাণহানির সমান। কারণ, পরিবারের উপার্জনকারীর মৃত্যুতে তার উপর নির্ভরশীলদের জীবনও এলোমেলো হয়ে যায়। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার বড় উত্স বাস-ট্রাক। আর সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে আছে অতিরিক্ত গতি, চালকের বেপরোয়া মনোভাব, লাইসেন্স বিহীন বা ভুয়া লাইসেন্সধারী চালকের দ্বারা গাড়ি চালানো, সড়কে ফিটনেস বিহীন যান ইত্যাদি।

সম্প্রতি বাংলাদেশের সড়ক, মহাসড়কে ফিটনেস ছাড়া ঠিক কতসংখ্যক যান চলাচল করছে তার সঠিক তথ্য চেয়েছেন হাইকোর্ট। মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ অনুযায়ী প্রতিবছর মোটরযানের ফিটনেস নবায়ন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিআরটিএ জানিয়েছে, ২০০৯ সালের জানুয়ারির পর এসব যানবাহনের ফিটনেস সনদ আর নবায়ন করা হয়নি। নবায়ন ছাড়াই ৭১ হাজার ২১৮টি যান সড়কে চলছে বলে দাবি করছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ। আর এসব ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করেন অনেকে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মুখে সরকার সড়কে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে যে নতুন সড়ক পরিবহন আইন করেছে, সেই আইন সড়কে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট, যদি এর যথাযথ প্রয়োগ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক সচেতন হয়। আর যদি যখন আন্দোলন তখন আইনের প্রয়োগ আন্দোলন শেষে ‘যেই লাউ সেই কদু’ হয়। তাহলে নিরাপদ সড়কের স্বপ্ন, শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়