মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ জানায়, তাদের বিশ্বাস খাশোগিকে হত্যার
নির্দেশ সৌদি যুবরাজই দিয়েছিলেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, এরকম একটি হত্যাকাণ্ড ঘটানোর অভিযান কেবল যুবরাজের অনুমতি নিয়েই হতে পারে।
তবে সৌদি আরব এরকম দাবিকে মিথ্যা বলে বর্ণনা করেছে
খাশোগি হত্যাকাণ্ড
প্রমাণ করে যে, যুবরাজ সালমান নীতি, মূল্যবোধ-ভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থাকে কতটা গুরুত্ব দেন। এ কাজে সমর্থন দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে অপরিসীম ক্ষমতাধর হওয়ার পথে যে বাধা ছিল তা
দূর করে দিলেন
তালেব রানা
সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখনো হয়নি। যদিও এটা ‘নিশ্চিত’ হওয়া গেছে ২ অক্টোবর ইস্তাম্বুলস্থ সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পরপরই তাকে হত্যা করা হয়েছে। সৌদি আরবের একটি ‘কিলিং স্কোয়াড’ এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করেছে। ঘটনার কিছু অডিও রেকর্ডে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানা গেছে। তুরস্কের বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের কড়া সমালোচক হিসেবে খাশোগিকে হত্যার পর মরদেহ টুকরো টুকরো করা হয়। এরপর তা এসিডে গলিয়ে ফেলা হয়েছে। তার মরদেহ না পাওয়ায় এই তথ্য অনেকটাই সত্য বলে মনে করা হচ্ছে।
এই হত্যাকাণ্ডে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান জড়িত নন সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়েছে। সৌদি সরকার এ ঘটনাটি নিজেদের মতো করে তদন্ত করে ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। এর মধ্যে পাঁচ জনকে ফাঁসির সাজা দিতে চায় সৌদি আরব। চারজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে বরখাস্তও করা হয়েছে। তবে এ হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতার ব্যাপারে কিছুই বলেনি। যদিও প্রথম থেকেই হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে সবার সন্দেহের শীর্ষে রয়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। কারণ যুবরাজই সৌদি আরবের কার্যত সরকার প্রধান। তার নির্দেশ ছাড়া দেশটিতে কোনো কিছুই হয় না। তুরস্কের প্রসিডেন্ট রিসেপ তাইপে এরদোয়ানের দাবি খাশোগি হত্যার নির্দেশ সৌদি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এসেছে। তার এই দাবির সঙ্গে অনেকেই একমত।
গত সপ্তাহে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ জানায়, তাদের বিশ্বাস খাশোগিকে হত্যার নির্দেশ সৌদি যুবরাজই দিয়েছিলেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, এরকম একটি হত্যাকাণ্ড ঘটানোর অভিযান কেবল যুবরাজের অনুমতি নিয়েই হতে পারে। তবে সৌদি আরব এরকম দাবিকে মিথ্যা বলে বর্ণনা করেছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবেইর বলেছেন, সাংবাদিক খাশোগির হত্যাকাণ্ডে যুবরাজের অপসারণ চাওয়া অতিরঞ্জিত।
তবে সৌদি আরবের ভূমিকার চেয়েও এক্ষেত্রে কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প! সিআইএ’র প্রতিবেদন দেওয়ার পর ট্রাম্প বলেছেন, সাংবাদিক খাশোগি হত্যাকাণ্ডে সৌদি আরবের যুবরাজকে দায়ী করেনি সিআইএ। গত বৃহস্পতিবার ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, সিআইএ’র তদন্তে এ সিদ্ধান্তে আসেনি যে, যুবরাজ মোহাম্মদই হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থাটি বলেছে, যুবরাজ হত্যার নির্দেশ দিতেও পারেন, নাও পারেন। তাই এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় না যে, যুবরাজই নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরো বলেন, বাদশাহ সালমান এবং তার পুত্র বারবারই সাংবাদিককে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তিনি সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে সমর্থন জানিয়েছেন। ট্রাম্পের এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছে তুরস্ক। দেশটি বলেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অন্ধভাবে যুবরাজ সালমানকে সমর্থন দিয়েছেন।
ট্রাম্পের এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করছেন মার্কিন রাজনীতিকরাও। বিরোধী ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের গোয়েন্দা কমিটি জানিয়েছে, খাশোগির হত্যাকাণ্ডে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া খতিয়ে দেখা হবে। যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরবের সম্পর্ক গভীরভাবে খতিয়ে দেখার অংশ হিসেবেই ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া তদন্ত করা হবে। খাশোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে অন্যতম মার্কিন মিত্র সৌদি আরবের পক্ষে নেওয়া অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প বারবার অস্ত্র চুক্তি ও ইরান প্রশ্নে তাদের কৌশলগত অবস্থানের কথা বলেছেন।
ট্রাম্পের এই অবস্থানের সমালোচনা করে মার্কিন রাজনীতিকরা বলেছেন, মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের শ্লোগান ছিল আমেরিকা ফার্স্ট। এখন দেখা যাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে সৌদি আরব ফার্স্ট, সৌদি যুবরাজই ফার্স্ট। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দলের নেতারা জানিয়েছেন, খাশোগি হত্যকাণ্ডে সৌদি আরব ও যুবরাজ মোহাম্মদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপে জোর চেষ্টা চালাবেন তারা।
ম্যাক্লিনস.সিএ নামের অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, সাদা আর কালো ছাড়া বিশ্বে অন্য কিছু দেখার সক্ষমতা যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেই সেটা গেল সপ্তাহে আবারো প্রমাণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, রাজনৈতিক-উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ডের চেয়ে অর্থ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য আসাটা এখন অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয়। তবে সারা বিশ্বে এর একটি প্রতিক্রিয়া রয়েছে। যেটা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আদর্শ, মূল্যবোধের পরিপন্থী। সিআইএ হত্যকাণ্ডের জন্য যুবরাজকে দায়ী মনে করলেও ট্রাম্প বলছেন, তাতে কী? আসলে ট্রাম্পের সেই বুদ্ধিমত্তার যথেষ্ট অভাব রয়েছে যেটা তার পূর্বসূরীদের মধ্যে ছিল। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে নীতি, মূল্যবোধ-ভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন। তার কাজের ধরন মাফিয়াদের মতো। তার এই কাজের ধরনটা সেই বিশ্বেই ভালো কাজ করে যেখানে আইন, শাসন গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেই বিশ্বই নির্মাণের চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। খাশোগি হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যে, যুবরাজ সালমান নীতি, মূল্যবোধ-ভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থাকে কতটা গুরুত্ব দেন। এ কাজে সমর্থন দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে অপরিসীম ক্ষমতাধর হওয়ার পথে যে বাধা ছিল তা দূর করে দিলেন।
