নাজনীন সুলতানা নীতি
গাজায় যুদ্ধবিরতি ইসরাইয়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের গদি নড়বড়ে করে দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির কারণে ক্ষমতাসীন জোট সরকারের শরিক একটি দলের সমর্থন প্রত্যাহারের পর বেকায়দায় পড়েছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যদিও এটি করা ছাড়া অন্য কোনো গত্যন্তর তার ছিল না। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন যে, শক্তিশালী হামাস এবং ফিলিস্তিনের দুর্বার জনগণ, এই দুয়ের উপস্থিতিতে গাজায় আরেকটি যুদ্ধ ইসরায়েলি সরকারের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। নেতানিয়াহু এটা ভালো করেই জানেন। সেজন্যই গাজায় বিমান হামলার কিছুদিনের মধ্যেই তাকে যুদ্ধবিরতি চাইতে হচ্ছে। সরকারকে সংকটের মধ্যে ফেলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর গাজার সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পেছনে আরেকটি বড় কারণ ইরান। ইরান এবং তার মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করা আঞ্চলিক ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর প্রধান অগ্রগণ্য বিষয়। গাজাকে সংঘাতমুক্ত রাখতে পারলে অঞ্চলটিতে ইরানের প্রাধান্য নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে ইরানকে প্রতিহত করা সহজ হবে।
সর্বশেষ গাজায় পরিচালিত ইসরায়েলের গোয়েন্দা অপারেশনটি আর দশটি স্বাভাবিক সাধারণ গোয়েন্দা অপারেশনের মতোই ছিল। ইসরায়েলের এজেন্টরা ‘শত্রু ভূখণ্ডে’ প্রবেশ করতে পারে, অভিযান চালাতে পারে এবং কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাজ শেষ করে বেরিয়েও আসতে পারে। একাজ ইতিপূর্বেও হয়েছে, একাধিকবার। সত্যি বলতে, গত দুই বছরে ইসরায়েল সফলতার সঙ্গে দুই দুটো হাই প্রোফাইল গোপন অভিযান চালিয়েছে। আর তাতে ২০১৬ সালে তিউনিশিয়ায় নিহত হয়েছেন হামাসের ড্রোন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আল জাওয়ারি এবং মালয়েশিয়ায় ২০১৮ সালের এপ্রিলে নিহত হন পণ্ডিত ফাদি-আল-বাত্স। তবে ১১ নভেম্বর গাজায় পরিচালিত ইসরায়েলের গোয়েন্দা অভিযানটি খুব একটা পরিকল্পনা মাফিক হয়নি। হামাস গোপন অভিযানটি প্রাথমিক স্তরেই ধরে ফেলে এবং প্রতিহত করে। তারা উল্টো আক্রমণ করে এবং ইসরায়েলি জেটবিমান থেকে বর্ষিত প্রবল গোলাবর্ষণের ভেতরেও পলায়নপর ইসরায়েলি কমান্ডোদের পেছনে ধাওয়া করে। সাত জন ফিলিস্তিনি এ অভিযানে নিহত হন যার মধ্যে প্রতাপশালী আল-কাসেম ব্রিগেডের কমান্ডার নূর বারাকা এবং একজন ইসরায়েলি অজ্ঞাতনামা লেফটেন্যান্ট কর্নেলও ছিলেন। অভিযানের জবাবে হামাস ইসরায়েলে শতাধিক রকেট হামলা চালায়। তাদের পাল্টা এ আক্রমণে একজন ইসরায়েলি বেসামরিক ব্যক্তিসহ ডজনের বেশি আহত হয়। এ হামলায় হামাসের সামরিক শাখা করনেট রকেটের (রাশিয়ান এ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল) ব্যবহারও করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাসকে লক্ষ্য করে। হামাস এ অস্ত্রের ব্যবহার ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধের পর এবারই প্রথম করল।
ইসরায়েল সরকারও দিনব্যাপী গাজায় আকাশপথে তড়িত্ বিমান হামলা চালিয়েছে। বেসামরিক বাড়ি-ঘরের ওপর তাদের হামলায় পাঁচজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়। তবে ইসরায়েলের এ পাল্টা হামলায় রাজনৈতিক যে ক্ষতি ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে তা পূরণ হওয়াটা কষ্টকর। অন্যদিকে হামাসের কাছে এ এক অভূতপূর্ব বিজয়। করনেট অ্যাটাকের একটি ভিডিও আরবব্যাপী এবং ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলোতে ইতোমধ্যেই ব্যাপক প্রচার হয়েছে। গাজার ফিলিস্তিনিরা মহা উল্লাসে বলছে, ‘করনেট, ইসরায়েলকে পরাজিত করেছে’।
এ ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর কাছে নতুন কোনো কৌশল দেখানোর সুযোগ ছিল না। গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি করতে তিনি বাধ্য হয়েছেন। এ সিদ্ধান্তের পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী এভিগদর লিভারম্যান পদত্যাগ করেছেন যা নেতানিয়াহুর সরকারকে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি করেছে। নিজের তৈরি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা থেকে দৃষ্টি সরাতে গাজায় নতুন সংঘাত উসকে দেওয়ার যে পাঁয়তারা নেতানিয়াহু সব সময় করে থাকেন, এবার সেটি কাজ করবে না। মধ্যপ্রাচ্যে তার ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকা এবং পুনর্জাগরিত হামাসের প্রতাপে কোণঠাসা হয়ে গেছে।
ইসরায়েলি সরকার জোর দিয়ে বলেছে, ১১ই নভেম্বরের অভিযান কোন গুপ্তহত্যার মিশন ছিল না, যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত কোন তথ্য তারা দেয়নি। বিশ্লেষকরাও যুক্তি দিয়েছেন, এটা শুধুই একটি গোয়েন্দা অপারেশন ছিল, নতুন কোন যুদ্ধের দামামা নয়। নেতানিয়াহু তার এই অভিযান দিয়ে কি অর্জন করতে চেয়েছিলেন তার চেয়েও লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইসরায়েলের এই ব্যর্থ অভিযানে হামাস বেশ লাভবান হয়েছে। এই জয় শুধুমাত্র ইসরায়েলের গোয়েন্দা বাহিনীর ক্ষমতার দৌড় কতটুকু সেটি যেমন দেখিয়েছে, একই সাথে তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়টিও ফুটিয়ে তুলেছে যা দূরবর্তী দেশগুলোতে জটিল অভিযান পরিচালনায় সক্ষম অথচ পার্শ্ববর্তী গাজাতেই তারা মুখ থুবড়ে পড়ল।
নেতানিয়াহুর অধীনে এবারই প্রথম নয় যখন তার তত্ত্বাবধানে একটি গোয়েন্দা অভিযান ভয়ানকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৯৭ সালে তিনি হামাস নেতা খালেদ মেশালকে গুপ্তহত্যার জন্য এজেন্ট নিয়োগ করেছিলেন। খালেদ তখন জর্ডানে অবস্থান করছিলেন। নেতানিয়াহু তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যার জন্য দুই জন ইসরায়েলিকে পাঠিয়েছিলেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই ঐ দুই জন ধরা পড়ে যায় এবং মেশালের দেহরক্ষীদের হাতে মার খেয়ে ফিরে আসে। এ ঘটনায় ইসরায়েল ও জর্ডানের মধ্যে বড় ধরনের কূটনৈতিক সংকটের সূচনা হয়। যদিও নেতানিয়াহু অভ্যন্তরীণ তদন্তে নিজেকে সব ধরনের ত্রুটিমুক্ত প্রমাণ করেছেন, তবুও সামপ্রতিক ব্যর্থ অভিযানটি দুই বছর পর আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে তার জন্য বড় ধরনের পরাজয় বয়ে আনতে পারে।
১৯৯৭ সালের ঐ গুপ্তহত্যার ঘটনা এবং ১১ই নভেম্বরের অভিযান দুটোই হামাসের জন্য বড় ধরনের বিজয় ছিল। দুটো ঘটনাই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে হামাসের রাজনৈতিক স্বার্থ সুসংহতকরণে এবং এর সামরিক সামর্থ্য প্রদর্শনের সুযোগ করে দিয়েছে। এর দ্বারা এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, হামাসকে দুর্বল করতে গাজায় ইসরায়েলের এক দশকের অবরোধ প্রকৃত অর্থে ব্যর্থ হয়েছে। ইসরায়েলের অবরোধে ফিলিস্তিনি জনগণের মনোবল বিন্দুমাত্র নষ্ট হয়নি। ২০ লক্ষ মানুষকে বিশ্বের সবচেয়ে উন্মুক্ত জেলখানায় ১০ বছরেরও অধিক সময় বন্দি করে রাখা কোন সান্ত্বনার বিষয় নয় নিশ্চয়ই।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যে আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে বিশেষ করে সৌদি আরবকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগে ইরান বিরোধী একটি ঐক্যফ্রন্ট গঠন করতে চান যা ‘আলটিমেট ডিল’ হিসেবে পরিচিত হবে। এই ডিলের উদ্দেশ্য ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডগত সমাধান ও নেতৃত্ব সংক্রান্ত বিষয় এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক সহজীকরণের মাধ্যমে এই অঞ্চল থেকে ইরানকে দূরে সরিয়ে রাখা। গত কয়েক মাসে নেতানিয়াহু এই সহজীকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একাধিক প্রয়াস নিয়েছেন, যার মধ্যে একটি হলো গত মাসে ওমান পরিদর্শন যাদের ঐতিহ্যগতভাবেই ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক আছে। গাজায় যুদ্ধবিরতির বিষয়টিও এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়। নেতানিয়াহু গাজাকে শান্ত রাখার জন্য এত আগ্রহী হওয়ার অন্যতম কারণ ইসরায়েলের প্রতিবেশী দেশ সিরিয়া ও লেবাননে ইরানের উপস্থিতি। এ নিয়ে নেতানিয়াহু বেশ উদ্বিগ্ন। গত সেপ্টেম্বরে সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক বিমান ভূপাতিত হওয়ার পর রাশিয়ার সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ক জটিল রূপ ধারণ করে। এরপর সিরিয়ায় রাশিয়া-ইসরায়েলের একীভূত সামরিক কর্মকাণ্ড অবশিষ্ট থাকেনি। আবার লেবাননে ইরানের উপস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের আশঙ্কা ক্রমাগত বাড়ছে কেননা এতে হিজবুল্লাহর সামরিক ক্ষমতা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের ভাগ্যের অনিশ্চয়তাও ভাবিয়ে তুলেছে নেতানিয়াহুকে। এ বিষয়টিও হামাসের সঙ্গে একটি সমঝোতায় আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে তাকে। সব দিক বিচার করলে, হামাসকে এই মুহূর্তে দমন করতে না পারার ভয় এবং ইরানকে প্রতিহত করার সামর্থ্য পুরোপুরি অর্জন না করা পর্যন্ত হয়তো হামাসের সাথে আপাতত যুদ্ধবিরতিকেই শ্রেয় মনে করেছে ইসরায়েল।
