কম্বোডিয়া হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। তাই সেখানে
বনরক্ষীরাও যে বেশি দুর্নীতিবাজ, সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেখানে গাছ চোরেরা গরিব রেঞ্জারদের
খুব সহজেই কিনে নিতে পারে। ফলে বন উজাড়ও চলতে থাকে অবাধে। এই সর্বগ্রাসী অবস্থা থেকে জঙ্গলকে
একমাত্র স্থানীয় বাসিন্দারাই রক্ষা করতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে
আশেক খান আলেখীন
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ কম্বোডিয়া। প্রকৃতি অকৃপণভাবে সাজিয়েছে দেশটিকে। নদী-নালা, খালবিল, পাহাড়, জঙ্গল- সবই আছে কম্বোডিয়ায়। এর তিনদিক ঘিরে রয়েছে থাইল্যান্ড, লাওস ও ভিয়েতনাম এবং একদিকে সাগর। প্রায় ৭০ হাজার বর্গমাইল আয়তনের এই দেশটির এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বন্যপ্রাণীদের অভয়ারণ্য ‘বেং পার’ নামে অভয়ারণ্য হলেও প্রকৃতপক্ষে সেটিকে এখন আর অভয়ারণ্য বলা যায় কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, গাছ চোরদের দৌরাত্ম্য এবং সেই সঙ্গে সরকারের শিল্পায়ন ও নগরায়ণ সম্প্রসারণ নীতির ফলে বেং পার অভয়ারণ্যের আকার কমতে কমতে এখন ২ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ হেক্টরে এসে ঠেকেছে। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বেং পার-এর ৩৩ শতাংশ জঙ্গল উজাড় হয়েছে। জঙ্গল উজাড়ের এই হার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। জঙ্গল উজাড়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশটির পরিবেশ দূষণের মাত্রাও অনেক বেড়ে গেছে। ২০১৬ সালের গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টাল পারফরমেন্স ইনডেক্সে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে কম্বোডিয়ার অবস্থান ছিল ১৪০-এ।
বেং পার অভয়ারণ্যের একটি অংশ হচ্ছে চং পেন ফরেস্ট, যেটি বেং পার-এর একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত। এই জঙ্গল থেকে ফলমূল, কাঠ ও মধু আহরণ করেই জীবনধারণ করছে জঙ্গল লাগোয়া ছোট্ট গ্রাম ব্যান খানপাল-এর বাসিন্দারা। ভালোই কাটছিল তাদের দিন, কিন্তু ‘বন খাদকদের’ লোলুপ দৃষ্টি এখন এসে পড়েছে চং পেন ফরেস্টের ওপর। সেখান থেকেও গাছ চুরি শুরু হয়ে যাচ্ছে। গাছ চুরি বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন বা সরকার মাঝে মাঝে পদক্ষেপ নিলেও তা খুব একটা কার্যকর হয়নি। বনরক্ষীরা মাঝে মাঝে এসে লোকদেখানো টহল দিয়ে গেলেও গাছ চুরি বন্ধ হয় না।
চলতি বছরের প্রথমদিকে গাছচোরদের সঙ্গে সংঘর্ষে একজন মিলিটারি পুলিশ অফিসার, একজন ফরেস্ট রেঞ্জার এবং একজন পরিবেশ কর্মী নিহত হন। এ অবস্থায় বনরক্ষায় আর সরকারের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না এখানকার আদিবাসীরা। জঙ্গল রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন আদিবাসী বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা। তারাই এখন কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে জঙ্গলের বিভিন্ন অংশ পাহারা দিচ্ছেন। এদের একজন ৬৭ বছর বয়সী র্লয়স লিম, যিনি একটি টহল দলের নেতাও বটে। লিম বলেন, জঙ্গল রক্ষায় আমরা আর প্রচলিত আইনের ওপর নির্ভর করতে পারছি না। কারণ আইনের গতি খুবই ধীর। যে জঙ্গল আমাদের খাওয়া-পরা দেয়, তাকে রক্ষার জন্য আমরা নিজেরাই এগিয়ে এসেছি। দিন-রাত আমরা জঙ্গল পাহারা দিচ্ছি।
লিম মনে করেন, জঙ্গল ধ্বংস হলে একসময়ে তার সমাজ, ভাষা, সংস্কতি, ঐতিহ্য সবই ধ্বংস করে ফেলা হবে। লিম বলেন, জঙ্গল আমাদের কাছে অনেকটা ব্যাংকের মতো। আমরা এর পরিচর্যার জন্য এতে বিনিয়োগ করি আর তার বিনিময়ে জঙ্গল আমাদের অনেক কিছুই দেয়। এই গাছপালা, খাল, পাহাড়- এর সবই আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্য। এই জঙ্গল আমাদের ঐতিহ্য এবং গাছচোরদের হাত থেকে আমরা অবশ্যই একে রক্ষা করব।
প্রাণপ্রিয় জঙ্গলকে রক্ষায় লিমসহ আদিবাসীরা যথেষ্ট দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেও তারা তা কতটুকু করতে পারবে তা নিয়ে অনেকের সংশয় রয়েছে। কারণ বিশ্বব্যাপী যেভাবে বৃক্ষ নিধন চলছে, যেভাবে কোটি কোটি ডলারের এই বাণিজ্যে সামিল হচ্ছে ধনাঢ্য প্রভাবশালী ব্যক্তি, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি লোকেরাও, তাতে জঙ্গল রক্ষায় লিমদের আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। কম্বোডিয়ার অভয়ারণ্যের কোনো কোনো অংশ লিজ নিয়ে সেখানে গাছপালা কেটে রাবার বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। এটা জঙ্গল ধ্বংসের একটা কৌশল বলে মনে করছেন অনেকে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকারের লোকজনও এখন এই জঙ্গল-বাণিজ্যে সামিল হয়ে পড়েছেন। ২০১১ সালে কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের অন্যতম সহযোগী ট্রাই ফিপ জঙ্গলের ১০ হাজার হেক্টর জমির গাছপালা কেটে সেখানে রাবার বাগান করেছেন এবং এর বিনিময়ে অভয়ারণ্যে ১ লাখ ডলার খরচ করে বনরক্ষীদের জন্য একটি অফিস করে দিয়েছেন। একদিকে বন কেটে সাফ করে অন্যদিকে জঙ্গল রক্ষার জন্য রেঞ্জার স্টেশন করে দেওয়াটাকে রীতিমত প্রহসন বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতে, কম্বোডিয়া হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। তাই সেখানে বনরক্ষীরাও যে বেশি দুর্নীতিবাজ, সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেখানে গাছ চোরেরা গরীব রেঞ্জারদের খুব সহজেই কিনে নিতে পারে। ফলে বন উজাড়ও চলতে থাকে অবাধে। এই সর্বগ্রাসী অবস্থা থেকে জঙ্গলকে একমাত্র স্থানীয় বাসিন্দারাই রক্ষা করতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
