চারজন মেয়ে আর চারজন ছেলে, আটজনের একটি ক্রিকেট দল। তাদের গড় বয়স ১৫ বছর। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট মোহাম্মদ রুবেল, বয়স ওর বারো বছর। লন্ডন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ৩য় শ্রেণির শিক্ষার্থী। আর সবার বড়জনের বয়স ১৬ বছরের একটু বেশি। এই ক্রিকেট দল আগামী ২৮ এপ্রিল ইংল্যান্ড যাচ্ছে একটি বিশ্বকাপ খেলতে। ৩০ এপ্রিল থেকে ৯ মে পর্যন্ত চলবে এ খেলা। অন্য ওয়ার্ল্ড কাপের সঙ্গে এর পার্থক্যটা হলো এটা স্ট্রিট চাইল্ড ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ-২০১৯। এবছরই প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয়েছে এই প্রতিযোগিতার। বাংলাদেশ দলের এই খেলোয়াড়রা বড় হয়েছে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএফ) সদস্য সংস্থা ‘লিডো’র শিশু সদনে। মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বিএসএফ-এর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কথা হয় তাদের সঙ্গে। জানা যায় নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তাদের রঙিন স্বপ্নের বীজবোনার কথা। রুবেল ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে অন্য সব ছেলেমেয়েদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পড়াশোনাসহ প্রায় সব কিছুতেই প্রথম হয়। অন্য শিক্ষার্থীদের অভিভাবক তাই মাঝে-মধ্যেই রুবেলের পড়াশোনার খোঁজ-খবর করেন। কিন্তু রুবেল জানে না তার বাবা-মা কে। শুধু জানে তার অভিভাবক ‘লিডো’র নিবার্হী পরিচালক ফরহাদ হোসেন। যিনি জগত্ বিখ্যাত বিজ্ঞানী আর গুণিজনের জীবনী তার কাছে তুলে ধরেন। সেই সম্পর্কে জেনে জেনেই আজ রুবেল বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন বুনে। খেলা কেমন হবে প্রশ্ন করলে হেসে উত্তর দেয় আমি বোলিং খুব ভালো করি। আপনারা দোয়া করবেন, আমরা দেশের মান রাখতে পারব। স্বপ্না আক্তার সুমী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একাডেমি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। বরাবরই ভালো ফল করা সুমী ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নের কথা জানায়, ক্রিকেটকেই সে ভালোবাসে। কিভাবে ‘লিডো’তে এলে জানতে চাইলে জানায় বাবা-মা মারা যাওয়ার পর বোনের বাড়িতে জায়গা হয় তার। সে ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করার পরও বোনের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারছিল না। বোনের শাশুড়ির গালমন্দ আর দুলাভাইয়ের কুদৃষ্টি তাকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করে। ঢাকা সদরঘাট এসে দেখতে পারে এখানে তার পড়াশোনা সম্ভব নয়ই বরং আরো কত লোকের কুদৃষ্টি অপেক্ষা করছে। তবে ভাগ্য ভালো দুই দিনের মাথায় ‘লিডো’র একটি উদ্ধার টিম তাকে নিয়ে আসে। আরজু এবছরই এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। মা মারা যাওয়ার পর বাবা তাকে একটি বাড়িতে কাজ করতে দেয়। সেই বাড়ির হোটেলে তার বড় বড় পাতিল মাজতে ভালো লাগত না বলে এক লোকের সঙ্গে ভালো জায়গায় যাওয়ার আশায় চলে আসে মিরপুর এক নম্বরের মাজারে। তারপর এক তথাকথিত খালা তাকে আর এক নরকে নিয়ে যায়। যেখানে ছোট ছোট মেয়েদের যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অনেক ছোট হওয়ায় আর অনবরত কান্নাকাটি করায় এক লোক তাকে টাকা দিয়ে কিনে লিডোতে দিয়ে যায়। পরীক্ষা কেমন হয়েছে জানতে চাইলে জানায় ফলাফল ভালো হবে আশা করছে। আরজু জাতীয় পর্যায়ের অনেক অনুষ্ঠানে নেচে প্রশংসা কুড়িয়ে আজ স্বপ্ন দেখছে ছায়ানটে ভর্তি হবে। ভবিষ্যত্ গড়বে নৃত্যশিল্পীর ক্যানভাসে। আর একেবারে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর জেসমিন আক্তার ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। একটি বাসায় কাজ করত সে। নানা বঞ্চনা আর অত্যাচারের জীবনের অবসান ঘটিয়ে এসেছে ‘লিডো’র একজন হয়ে। জানায় ফারাদ হোসেনই তাদের বাবা-মা। এই টিমের নিজাম হোসেন, সানিয়া মির্জা, রাসেল ইসলাম, আবুল কাসেমসহ সবার গল্পই ঘুরেফিরে এক জায়গায় মিশে যায়। সবকিছু পেছনে ফেলে এখন দেশের পরিচয় নিয়ে যাচ্ছে তারা এটাই অনেক অনুপ্রেরণার। তারা জানায়, এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার আগে তাদের পাসপোর্ট নিয়ে সমস্যা হয়। তখন তারা সবাই ভেবেছিল এই বুঝি ভেস্তে গেল ইংল্যান্ডে খেলা। কিন্তু ফরহাদ হোসেন অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শেষ পর্যন্ত পাসপোর্টের ব্যবস্থা করেন। ব্যস তাদের প্রস্তুতির পরীক্ষা দেওয়া অপেক্ষা এখন। ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘যেহেতু তাদের পরিচয় নিয়ে সংশয় আছে। তাই পাসপোর্ট হতে সমস্যা দেখা দেয়। আমরা কোর্টের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব অর্জন করে পাসপোর্ট পাই।’ তিনি আশা করেন ওরা ভালো করবে। তিনি জানান লিডো’র এখন ৫৪ জন শিশু আছে। বিদেশি ফান্ড ছাড়া নিজেদের আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের টাকায় পড়াশুনাসহ খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক বিষয়ও প্রশিক্ষণ নিচ্ছে তারা। মেধাবী এই শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ছেলেমেয়েদের চেয়ে ভালো করছে। ফরহাদ আরও জানান, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে কথা চলছে, এই টিম ফিরে এলে এখান থেকে কাউকে কাউকে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৫ টিমে নেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
