তরুণদের মাঝে বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণে বাংলাদেশ সায়েন্স ফিকশন সোসাইটি

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:০৪

>> মেহেদী হাসান গালিব

 

বাংলাদেশ সায়েন্স ফিকশন সোসাইটির গল্পটা শুরু হয়েছিল এক সন্ধ্যার আড্ডায়। অনেকদিন থেকেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোশতাক আহমেদ সায়েন্স ফিকশন লেখকদের নিয়ে কিছু একটা করার কথা ভাবছিলেন। এক সন্ধ্যায় তিনি তার ভাবনার কথা জানান আজহারুল হক ফরাজী ও খন্দকার রাফিকে। ফরাজী ও রাফিও বেশ কিছুদিন থেকেই ভাবছিলেন সায়েন্স ফিকশন আমাদের দেশে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করলেও তা সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। আবার এই আধুনিক যুগেও স্কুল-কলেজের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বিজ্ঞান রীতিমতো একটি ভীতির নাম। তাই তারা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন এমন একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করার, যে সংগঠন হবে সায়েন্স ফিকশন লেখক-পাঠক ও প্রকাশকদের এক মিলনমেলা, যে সংগঠন স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কাজ করে যাবে আমাদের দেশের তরুণদের মাঝে বিজ্ঞানের ভয় দূর করে তা জনপ্রিয় করে তুলতে। আর এই সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ৮ নভেম্বর রূপ নেয় ‘বাংলাদেশের সায়েন্স ফিকশন সোসাইটি’ নামের একটি সংগঠনে। সংগঠনের এই পথচলায় শুরু থেকেই উপদেষ্টা হিসেবে সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে সংগঠনকে এগিয়ে নিতে কাজ করেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। পরবর্তীতে এর সঙ্গে যুক্ত হন অনিন্দ্য প্রকাশের প্রধান নির্বাহী আফজাল হোসেন, স্কয়ার ফার্মাসিক্যালের ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটিং ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম সবুজ, সময় প্রকাশনের ফরিদ আহমেদ, অন্বেষা প্রকাশনের শাহাদাত হোসেন, রোকসানা পারভীন, এসএম শাকিল আহমেদ খান ও সায়েন্স ফিকশন লেখক আসিফ মেহ্দী।

শুরুর পর থেকেই সংগঠনের সবার মনে কাজ করছিল দ্বিধা—একটু ভিন্ন আঙ্গিকের এই সংগঠনটিকে সবাই ভালোভাবে গ্রহণ করবেন তো? এই দ্বিধা ও সংশয় নিয়েই সংগঠনটি তাদের প্রথম কার্যক্রম হিসেবে ২০১৫ সালের ২ জানুয়ারি আয়োজন করে বাংলাদেশের প্রথম সায়েন্স ফিকশন বইমেলা। এবং আশ্চর্যজনকভাবে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেই হাজির হন পাঁচ শতাধিক বিজ্ঞান ও সাহিত্যপ্রেমী। এই অভূতপূর্ণ সাড়া সংগঠনের প্রতিটি সদস্যকে জোগায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস ও অনুপ্রেরণা।

রোবোটিক্স আমাদের দেশের তরুণদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করলেও অর্থের অভাবে অনেকেই রোবোটিক্সের চর্চাটা নিয়মিত চালিয়ে যেতে পারেন না। বাংলাদেশ সায়েন্স ফিকশন সোসাইটি এসব তরুণদের উত্সাহ ও অনুপ্রেরণা জোগানোর পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। সংগঠনের এক লক্ষ টাকা আর্থিক সহযোগিতায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণ শিক্ষার্থী তৈরি করেন প্রথম বাংলায় কথা বলতে পারা রোবট—রিবো। এ ছাড়াও এ পর্যন্ত স্কুল পর্যায়ের চারটি দলকে রোবট বানানোর জন্য আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হয়।

প্রথম থেকেই বাংলাদেশ সায়েন্স ফিকশন সোসাইটি সায়েন্স ফিকশন লেখক-পাঠক ও প্রকাশকদের মধ্যে একটি সুদৃঢ় বন্ধন তৈরি করার লক্ষ্যে কাজ করে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের মে মাস থেকে সংগঠনটি নিয়মিত একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করতে শুরু করে। নাম ‘বিজ্ঞান আনন্দ’। দেশের খ্যাতনামা লেখকদের পাশাপাশি বিজ্ঞান আনন্দে তরুণ ও নতুন লেখকদের লেখাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়। ফলস্বরূপ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিজ্ঞান আনন্দ তরুণ ও নতুন লেখকদের কাছে পরিণত হয় মেধার বিকাশ ও লেখালেখি চর্চার অন্যতম একটি প্লাটফর্মে। এ ছাড়াও বাংলা সাহিত্যে সায়েন্স ফিকশনের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে প্রবর্তন করা হয় সায়েন্স ফিকশন সাহিত্য পুরস্কার।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মাঝে জন্ম নেওয়া বিজ্ঞানের প্রতি ভয় কাটানোর জন্য বিজ্ঞানের বিভিন্ন মজার মজার পরীক্ষা দেখানোর ব্যবস্থা করে থাকে বাংলাদেশ সায়েন্স ফিকশন সোসাইটি। এ ছাড়াও নিয়মিত আয়োজন করে থাকে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও এস এম শাকিল আহমেদ খান উদ্ভাবিত টাইপিং মাস্টার প্রতিযোগিতা। এ ছাড়াও বিজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সংগঠনটির ভূমিকা বেশ প্রশংসার দাবিদার। প্রতি বছর দুইজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে মেধাবৃত্তি প্রদান, বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ ও শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করে থাকে সংগঠনটি। বর্তমানে সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ১৫ হাজারেরও অধিক। ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, শেরপুর ও নোয়াখালী শহরে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি। এ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে সংগঠনটির দুটি শাখা। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় ও প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের পরিধি বিস্তৃত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সায়েন্স ফিকশন সোসাইটি। সংগঠনের প্রতিটি সদস্য স্বপ্ন দেখেন একদিন এই সংগঠনের হাত ধরেই আমাদের দেশের তরুণ সমাজে বিজ্ঞান হয়ে উঠবে আরও জনপ্রিয়, তরুণেরা এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করেই আধুনিক ও ডিজিটাল একটি রাষ্ট্রে পরিণত করবে আমাদের সোনার বাংলাদেশকে।