নিনিত এখন ভাবতে শিখেছে

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ১৮:১১

নিনিতকে নিয়ে মা-বাবা চিন্তিত। সারাক্ষণ কী যেন ভাবে নিনিত। কিন্তু কোনোকিছু প্রকাশ করে না। আবার গম্ভীর হয়েও থাকে না। হাসিখুশি। তবে যখন কিছু একটা নিয়ে ভাবে, তখন চেহারায় বুদ্ধিমত্তার ছাপ পড়ে।

নিনিতদের বাড়ি ছোট্ট একটি নদীর ধারে। নদীর নাম চন্দনা। চন্দনায় আগের মতো থইথই জল নেই। এখন সাঁতরিয়ে পার হতে পারে নিনিত। পানির সঙ্গে তার মধুর সম্পর্ক। সম্পর্ক আছে পাখির সঙ্গে। সম্পর্ক আছে গাছের সঙ্গে। ফুলের সঙ্গে। ঘাসের সাঙ্গে। ফড়িঙের সঙ্গে। প্রজাপতির সঙ্গে।

নিনিত আকাশের দিকে তাকাল। দেখতে পেলো বেশ বড় আকারের মেঘ। অনেকটা স্থির হয়ে আছে। দূর থেকে আস্তে আস্তে উড়ে এল আরেক খণ্ড মেঘ। বড় মেঘের নিচ দিয়ে এই মেঘখণ্ডটি যেতে থাকল—মনে হলো ইচ্ছে করে অনেকটা ছুঁয়ে দিল। নিনিত কান পেতে শুনল ওদের কথা। বড় মেঘ বলল, তুমি কেমন আছ?

উড়ো মেঘ বলল, বেশ ভালো। তুমি আমার হাসি দেখে বুঝতে পারছ না?

বড় মেঘ বলল, বুঝতে পেরেছি। তবু কুশল বিনিময় করতে হবে তো! তাই জিজ্ঞেস করলাম। তা যাচ্ছ কোথায় এই মিষ্টি বিকেলে?

উড়ো মেঘ বলল, বন্ধুর বাড়ি। দাওয়াত খেতে। যাই গো বড় ভাই।

টা-টা দিয়ে মেঘখণ্ডটি বড় মেঘটিকে অতিক্রম করল। বড় মেঘ তো হেসেই অস্থির। নিনিত ভাবল, বাহ্ কী সুন্দর! মেঘ আর মেঘে কী মধুর সম্পর্ক। একে অপরকে হিংসা করে না। একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ করে না। মেঘ আর মেঘে যুদ্ধ করলে কি আকাশ ভেঙে পড়ত?

নিনিত দেখেছে একসঙ্গে অনেকগুলো পাখি। পাখিরা একবার গাছের ডালে বসে, একবার উড়ে যায়। কিচিরমিচির করে। মিষ্টি সুরে গানও করে। কান পেতে পাখির গান শুনেছে নিনিত। কিন্তু কোনোদিন একটি পাখির সঙ্গে আরেকটি পাখির ঝগড়া হতে দেখেনি। একটি পাখি আরেকটি পাখিকে ঠোঁট দিয়ে আদর করেছে। পাখি আর পাখিতে কী মধুর সম্পর্ক। একে অপরকে দোষারোপ করে না। একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ করে না। পাখি আর পাখিতে যুদ্ধ হলে কি পাখিবংশ ধ্বংস হয়ে যেত?

নিনিতের ভাবনার কোনো শেষ নেই যেন। দূর্বাঘাসের মধ্যে ভাদাল ঘাস হতে দেখেছে। ভুঁইচাপা হতে দেখেছে। একটি ঘাসের সঙ্গে আরেকটি ঘাস পাল্লা দিয়ে বড় হয়। কিন্তু একটি ঘাস কখনো আরেকটি ঘাসকে হিংসা করে না। একে অপরকে নিন্দা করে না। ঘাস আর ঘাসে কী মধুর সম্পর্ক। একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ করে না। যদি ঘাস আর ঘাসে যুদ্ধ হতো তবে কি সারা মাঠ বিরান হয়ে যেত? তবে কি আলপথ বলে কোনো পথ থাকত না?

নিনিত দেখেছে একটি গাছের পাশে আরেকটি গাছ। শত শত গাছ পাশাপাশি থাকে। একটি গাছের ডালপালা আরেকটি গাছের ওপরে ভর দিয়ে থাকে। কখনো একটি গাছের ডাল আরেকটি গাছের বুক ভেদ করে যায়। পরস্পর জড়াজড়ি করে বড় হয়। গাছ আর গাছে কী মধুর সম্পর্ক। একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে না। গাছ আর গাছে যুদ্ধ করে না। আমরা জানি গাছ অক্সিজেন দেয়। যদি গাছ আর গাছে যুদ্ধ হতো তাহলে কি সব গাছ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত? তাহলে কি পৃথিবী আর এত সবুজ থাকত না? পৃথিবীতে কি আর অক্সিজেন থাকত না?

বাগানে কত ফুল। ফুলে ফুলে কত ভ্রমর। পাতায় পাতায় কত প্রজাপতি। ফুল আর ফুল কখনো যুদ্ধ করে না। ভ্রমর আর ভ্রমর কখনো যুদ্ধ করে না। প্রজাপতি আর প্রজাপতি কখনো যুদ্ধ করে না।

নিনিতের ভাবনায় ছেদ পড়ল, মা যখন খেতে ডাকল। খাবার টেবিলে গতকালও বাবা ওর মাকে একটি দুঃসংবাদ দিয়েছিলেন। পত্রিকা থেকে পড়ে শুনিয়েছেন আবার পাঁচ বছরের একটি শিশুহত্যার কথা। চকোলেটের লোভ দেখিয়ে ডেকে নিয়ে শিশুটিকে মেরে ফেলা হয়েছে। নিনিত মৃত্যুর কথা শুনলে আঁতকে ওঠে। জমি নিয়ে বিরোধ অথবা সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়া। তাতেই এমন বড় ক্ষতি হয়ে যায়। আবার, দেশে দেশে যুদ্ধ হয়। কত মানুষ প্রাণ হারায়। কত শিশু নিহত হয়।

মানুষ কেন মানুষকে হিংসা করে? মানুষ এবং মানুষে কেন দ্বন্দ্ব হয়? একজন মানুষ কেন আরেকজনের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়? মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সেরা জীব কেন এত নিষ্ঠুর হয়? মানুষ আর মানুষে কেন যুদ্ধ হয়?