এক বা একাধিক চরিত্র নিয়ে গল্পের বিস্তার। চরিত্র মানে মানুষ। মানুষের বাইরে অন্য কোনো প্রাণী, কি নির্দিষ্ট প্রকৃতি, নদী-সমুদ্র বা ঝড়-ঝঞ্ঝার সমবায়ে কাহিনি লিখিত হলেও শেষাবধি প্রাণের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। পৃথিবীতে যত মানুষ তত গল্প। নানা প্রকার, বিচিত্র চরিত্রের, হরেক রঙের যত মানুষ আছে তত ধরনের গল্প লেখা সম্ভব। এখন গল্প লেখেন লেখক নামের একজন মানুষ। তাঁর মোটা-পাতলা চিন্তা-ভাবনা, গভীর অবলোকন, নিজস্ব বিচার-বিশ্লেষণ, বলা যেতে পারে দেখা ও দেখানোর বৃত্তান্ত গল্পে আমরা পড়ে আসছি। মাথা খাটিয়ে কখনো কাহিনির পরতে পরতে, কখনো তল অব্দি হাতড়ে আমরা পেয়ে যাই বিভিন্ন বিবেচনা যা তৃপ্তির, মনের খোরাক মেটায়, কখনো গচ্ছিত রাখে বুদ্ধির আলো। কিন্তু কাহিনি সব নয়। লেখার জন্য প্রয়োজন পড়ে ভাষা ও আঙ্গিক। গল্প ও আঙ্গিকের উপযুক্ত মেলবন্ধনে একটি সফল গল্পের জন্ম। গল্প লেখার সময় নিজের পঠন-পাঠন থেকে পাওয়া পূর্বপ্রস্তুতি কিংবা পরিচিত সহজলভ্য গদ্যের আশ্রয় নেন লেখক। আবার কোনো কোনো লেখক গল্প লেখার জন্য স্বোপার্জিত গদ্য ব্যবহার করেন। এই যে নিজস্ব গদ্য সৃষ্টির পরিশ্রম এর সঙ্গে গড়পড়তা পাঠকের পরিচয় না থাকার কারণে ভাষা তার কাছে অচেনা, নতুন, দুর্বোধ্য, দুরূহ—কত কি মনে হতে পারে! লেখক তাই স্বীয় সাহিত্যের জন্য প্রত্যাশা করেন হূদয়সংবাদী পাঠক। অধ্যবসায়ী পাঠক মনোযোগী থাকেন নতুন সাহিত্যের রসাস্বাদনে। এমন কথার অবতারণা এজন্য যে, যাঁরা চলতি হাওয়ার পন্থি নন তাঁরা নতুন ধারার সাহিত্যসন্ধানী। বড়ই আনন্দের যে মহীবুল আজিজ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নতুন সাহিত্যানুশীলন গোত্রের অন্যতম এক কথাসাহিত্যিক হিসেবে গণ্য। তিনি নিজেও দশদিগন্তের সাহিত্যের অনুরাগী পাঠক। সাহিত্যের বীজ তিনি বিবিধ অগ্রসর সাহিত্যের জমি থেকে সংগ্রহ করে মননে ধারণ করেছেন। না, বিদেশি সাহিত্যের বাংলা কপি তিনি করেননি। স্বভূমিতে আধুনিক সাহিত্যের বীজ বপন করে তার ফসল আমাদের তিনি শিল্পসম্মতভাবে পরিবেশন করেছেন। তাঁর গল্পের মানুষ ও জগত্ চিরচেনা চৌহদ্দির, বাংলাদেশের জলহাওয়া প্রভৃতির সাম্প্রতিক চেহারাও আমরা উপলব্ধি করতে পারি ও দেখতে পাই। মহীবুল আজিজ গল্প লিখে পুরনো জংধরা, বহুল ব্যবহারে নিষ্ফলা কলাকৌশল খারিজ করে দিয়েছেন।
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে প্রাক্তন সাহিত্যাদর্শ বদলের জোর সাহিত্যচর্চার সূচনা হয়। সাহিত্যের কূলপ্লাবী ধারা বিভিন্ন মহাদেশ থেকে এসে আমাদের এখানেও প্রবাহিত হয়ে মনোরাজ্যে আলোড়ন তোলে। দুই বাংলাতেই তখন প্রচল সাহিত্যের বিপরীতে শুরু হয় নতুন সাহিত্য রচনার প্রয়াস। যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্রমাগ্রগতির সুবাদে বিদেশি সাহিত্যের বই প্রাপ্তি সহজ হলে আমাদের মননশীল কবি-সাহিত্যিক বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পরিবর্তিত নতুন রুচির ব্যতিক্রমী সাহিত্যের ভাঁড়ারে প্রবেশ করেন। আমরা লক্ষ করি, আমাদের কবিতা ও গল্পের পালাবদল। তখন ইউরোপীয় বাস্তব, পরাবাস্তবসহ একাধিক নবোত্থিত সাহিত্য-ইজম সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত হই। মানুষের মনোজগতের গতি-প্রকৃতি, বদলে যাওয়া ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন লক্ষ করি সাহিত্যে। সেই থেকে গ্রহণ বর্জনের এই প্রক্রিয়া দশকের পর দশক অতিক্রম করেও আজো অব্যাহত আছে।
সাম্প্রতিক কালে আমরা লাতিন আমেরিকার আলোচিত জাদুবাস্তবতা নামে যে সাহিত্য, আফ্রিকার সম্পূর্ণ লোকজ, মৃত্তিকাসংলগ্ন ধারা, পৌরাণিক ঐতিহ্য কিংবা রূপকাশ্রিত সাহিত্য সহজে পাঠ করতে পারছি। এই সাহিত্য আমাদের কথাসাহিত্যিকদের চিন্তা-চেতনায় যোগ করেছে আরো একটি নতুন মাত্রা। এই প্রয়াসকে প্রভাবিত বলতে চাই না, প্রাণিত হওয়ার উদ্যম বলতে চাই। পৃথিবীর সব দেশের সব কালের উল্লেখযোগ্য লেখকরা কোনো না কোনো সমৃদ্ধ সাহিত্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সৃষ্টি করেছেন আয়ুষ্মান সাহিত্য। এখানে কেবল আখ্যানের নতুনত্ব বোঝানো হচ্ছে না। প্রতিদিন জীবন যাপনে, চারপাশের বিরাজমান রূঢ় বাস্তবতা থেকে আমরা গল্প পাচ্ছি। এমন কথকতার জন্য লেখককে নবতর আঙ্গিকের অবলম্বন নিতে হচ্ছে। আঙ্গিক মানে লিপিকৌশল। একথা বলা যায়, গল্পের কথাবস্তু যদি লেখকের পুরো দখলে থাকে এবং কাহিনি ও আঙ্গিকের মাধ্যমে যথাযথ শিল্পগুণ গ্রাহ্য হয় তবে তা প্রকৃত সাহিত্য হয়ে ওঠে। কোনো কোনো লেখক নিজের গল্পে পাঠক প্রবেশ উপেক্ষা করেন ও আঙ্গিক-সর্বস্ব অনাচার করে সাহিত্যকে অক্ষরের শোভাযাত্রা করে তোলেন। ভরসা এখানে, নিজস্ব সৃষ্টির ক্ষেত্রে স্বরচিত দুর্বলতা মহীবুল আজিজ তাঁর গল্প বিন্যাসে প্রশ্রয় দেননি। লেখকের শক্তিশালী হাতই পারে শিল্পকে আহত ও ক্ষতিমুক্ত রাখতে। গত শতাব্দীর আশি দশক থেকে তিনি নিবিষ্ট মনে গল্পচর্চা করছেন। লিখতে লিখতে ক্রমশ তিনি পারদর্শী কথাশিল্পী হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধারার উজ্জ্বল গল্পকার তিনি।
বাড়তি বাহুল্যরহিত ছয়টি গল্প নিয়ে মহীবুল আজিজের ষষ্ঠ গল্পগ্রন্থ ‘নীলা মা হতে চেয়েছিল’। সূচনাগল্প ‘বিপজ্জনক কালরেখা’র শুরু অপমৃত্যুর শিকার শামসুল আলমের একমাত্র সন্তান নূরজাহানের শোকপ্রকাশ নিয়ে। লোকের ধারণা, নূরজাহানের অর্থ পৃথিবীর আলো হলেও তাঁর স্বামী মোহাম্মদ হোসেন স্ত্রীর নামের অর্থ মর্যাদাশূন্য অন্ধকারে পরিণত করেছে। যুবক মোহাম্মদ হোসেন মুন্সীপাড়ায় বাড়ি রঙ করার কাজ করতে এসে নূরজাহানকে দেখে নিজের মন রঙিন করে তোলে। পরে দুই মেরুর অসম বিয়ের কারণে উভয়ের দাম্পত্যজীবনে আসে টানাপোড়েন। জীবত্কালে মেয়ের পিতা শামসুল আলম একানব্বই’র ঘূর্ণিঝড়ে বাবা-মা হারানো ছয় মাসের নূর মোহাম্মদকে পেয়ে নিজের সন্তান হিসেবে লালন-পালন করেন। মৃত্যুর আগে এই পালিত পুত্রকে তিনি ভিটেসংলগ্ন জমি দিতে চান। সেই শুরু পরিবারে নিঃশব্দ দ্বন্দ্ব। রক্ত সম্পর্কের নয় বলে নূর মোহাম্মদ জমির মালিক হতে পারে না। মা তাহসিনা মেয়ে নূরজাহানকে এ বিষয়ে অধিক বাক্য ব্যয় করতে নিষেধ করেন। ভেতরে ভেতরে যদিও তিনি বেকার জামাইয়ের কবলে পড়া মেয়ের অন্ধকার ভবিষ্যত্ নিয়ে বিপন্ন বোধ করেন। শামসুল আলমের অপমৃত্যুর জন্য দায়ী মোহাম্মদ হোসেনের জেল হয়। একসময় খোঁজ-খবর, সন্ধানী তত্পরতায় পাড়া-প্রতিবেশীরা বোঝে নূরজাহানই তাঁর পিতাকে হত্যা করেছে। নূরজাহান এবার মুন্সীপাড়ায় একটা অশুভ আত্মার প্রতীকে পরিণত হতে থাকে। গল্পে আসে নতুন উপলব্ধি : নূরজাহান অর্থ পৃথিবীর আলো, অথচ এমন সুন্দর অর্থবোধক নাম নিয়ে সে তাঁর আপন জনকের চিরজনমের আলো নিভিয়ে দিয়েছে।
‘পতেঙ্গায় স্বর্ণের খনি’ গল্পে মেলবোর্ন অভিবাসী শিহাব দু বছর পর দেশে বেড়াতে এসে বন্ধুসহ পতেঙ্গায় যায়। বিদেশে সোনার খনি নিয়ে আলাপের মধ্যে এখানেও সোনার খনি আবিষ্কারের রঙ্গরসে বিভোর হয় তারা। এক আগন্তুক থেকে নেশার উপকরণের জোগান পেলে সমুদ্রতীর তাঁদের কাছে অব্যাখ্যেয় এক পটভূমি হয়ে যায়। একসময় চাপ চাপ ঠাণ্ডা ঘন অন্ধকার সৈকতের বিস্তীর্ণতাকে দীর্ঘতর করে তোলে। পকেট হাতড়ে দেখা গেল উভয়ের টাকা, ডলার, মোবাইলফোন সব হাওয়া। একটি দলবদ্ধ ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছে তারা।
নিপা নান্মী এক শ্যামলা অপূর্ব মুখশ্রীর মেয়ের প্রতি উত্তমপুরুষের আকর্ষণ, নীরব অনুরাগের গল্প ‘বেদনানুবাদ’। এই নিপার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। নিপা ছিল পোলিওতে আক্রান্ত মেয়ে। উত্তমপুরুষ বারান্দায় দাঁড়িয়ে শূন্য হতাশ দৃষ্টি মেলে নিপাদের বাসার জানালার দিকে চেয়ে থাকে। নিপা যেন বলছে, জানো, হাঁটতে পারি না। উত্তমপুরুষ অন্তর্লীন বেদনায় ক্রমাগত তা অনুবাদ করে চলে।
‘পকেট মারে যে’ গল্পে চৌরাস্তার মোড়ে মানুষ একজনকে পকেটমার সন্দেহে চড়-থাপ্পড় মারতে থাকলে চিত্কার করে জানায়—সে পকেটমার নয়। প্রাণপণে সত্য বলার এক দায় সে অনুভব করতে থাকে। একসময় লোকটার বর্ণনায় সত্যের নির্মোহ রূপ উদ্ভাসিত হলে অনেকেই নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত বোধ করে। হঠাত্ আশপাশ কাঁপিয়ে পুলিশের জিপ এসে দাঁড়ায়। ভিড়ের লোকেরা এবার লাঞ্ছিত মানুষটাকে পুলিশী হাতের ধকল পর্বে ঠেলে দিতে চায় না।
‘আমাদের সমুদ্র দিন’ গল্পে নববিবাহিত দম্পতি হানিমুনের জন্য গিয়েছে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে। এখানে বসে কফি পান করতে করতে জানা গেল, গায়ক আবিদ তাঁর বন্ধুসহ সমুদ্রে ডুবে মারা গেছে। শহরে ফেরার আগে তাদের জানা হয়ে যায়, শিল্পী আবিদকে আর জীবিত দেখা যাবে না। সদ্য বেদনাময় স্মৃতির মধ্যে উঠে আসে—কতকাল আগেকার এক খোকাবাবু বন্যার দিনে সিমাদের গ্রামের বাড়িতে পুকুরে ডুবে মারা গিয়েছিল। তার পায়ে ছিল এক জোড়া লাল টকটকে স্পঞ্জের স্যান্ডেল। গল্পে এই উপলব্ধি উঠে আসে যে, দুই জোড়া অসম পায়ের বাস্তবতা সত্ত্বেও সিমার অনুজের সেই লাল স্যান্ডেল কী অদ্ভুতভাবেই না এঁটে বসে আবিদের পায়ে।
নীলা নামের এক নারীর মাতৃসম্ভাবনা নিয়ে সংশয় নেই, কিন্তু তাঁর শরীরে বাচ্চার আশ্রয়স্থল ঝুঁকিপূর্ণ, অর্থাত্ নীলার জন্মগতভাবে এমন সমস্যা—জরায়ুর পরিবেশ বায়োলজিক্যালি রিস্কি। তবু নীলা মা হয়। এবার দেখা গেল বুকের দুধের সমস্যা। বাচ্চাকে মাতৃদুগ্ধ পান করাতে হবে। নীলার বুকে দুধ নেই। স্বামী হিরন অনেক দৌড়ঝাঁপ, বন্ধুর পরামর্শ ও বিভিন্ন জনের সহায়তায় পারুল, রাহনুমা ও আমিনা নামের তিন সাধারণ দরিদ্র মায়ের কল্যাণে তাঁদের বুকের দুধ জোগাড় করতে পারে। ইনকিউবেটর থেকে নার্স বাচ্চা তুলে দেয় নীলার কোলে। হাসির আভাস ফোটে নীলার ঠোঁটে-মুখে। এমনভাবে সে হাসে যে তাঁর চোখ বেয়ে পড়তে থাকে অশ্রু। হঠাত্ গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে ওঠে শিশুটি। ‘নীলা মা হতে চেয়েছিল’ গল্পে বাচ্চা যতই হাত-পা ছোড়ে আর কাঁদে নীলার কানে ঢুকে যেতে যেতে সেই কান্নার শব্দ মা-মা হয়ে যেতে থাকে। নারীর চিরন্তন মাতৃত্বের স্বাদ-আকাঙ্ক্ষা এই গল্পে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
মহীবুল আজিজের গল্পে ডিটেলেসর ব্যবহার বেশি। কাহিনির মর্মে পাঠককে নিয়ে যেতে লক্ষ করা যায় বিষয়ের সঙ্গে বিষয়ের জোড়। জাগ্রত মুহূর্তের সমষ্টি নিয়ে জীবন। তাঁর গল্পে অনুভবের বাহন হচ্ছে ব্যঞ্জনাঋদ্ধ ভাষা। রবীন্দ্রনাথের ‘ছোট প্রাণ ছোট কথা’য় মহীবুল আজিজের সমর্থন নেই। বিষয় বিষয়ান্তরের পটভূমি তৈরি করে আবার কুড়িয়ে লেখক নির্দিষ্ট গূঢ় তাত্পর্যে তা জমা রাখছেন। মহীবুল আজিজের অন্যতম কৃতিত্ব—চলিষ্ণু জীবনের বাস্তবতাকে ইন্দ্রিয়গোচর করার জন্য কলম কঠিন আঙুলে তিনি ধরে রাখেন।
