অডিটের নামে করদাতারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৫৪

সার্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার পর করদাতার হার অনেক বেড়েছে। কিন্তু ঢালাও অডিটের নামে করদাতারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এতে করদাতাদের মধ্যে ভীতিও ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আইসিএবি ভবনে প্রাক বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা এ কথা বলেন। ‘ কেমন বাজেট চাই’ শীর্ষক ওই আলোচনার আয়োজন করে যৌথভাবে আইসিএবি (ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টস অব বাংলাদেশ) ও প্রথম আলো। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। এ সময় অর্থনীতিবিদ, হিসাববিদরা বাজেট নিয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সবেক সহ-সভাপতি কামরুল ইসলাম বলেন, সার্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর মানুষ করের আওতায় আসতে শুরু করল। কিন্তু করদাতার ফাইল নিরীক্ষার নামে কর বিভাগ তাদের ক্ষমতা বাড়িয়ে নিল। এখন যে কোনো কর ফাইল অডিটের আওতায় আসছে। ফলে মানুষের মধ্যে ভয় ঢুকেছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ  কমিশনের (বিএসইসি, সাবেক এসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকীর বক্তব্যেও এই ইস্যুটি উঠে এসেছে। তিনি বলেন, সাধারণ করদাতারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিদ্যমান ব্যবস্থায় (সার্বজনীন স্বনির্ধারণী) আয়কর রিটার্ন দাখিলের পর ওইসব ফাইল ‘সিলেক্ট’ করার বিধান থাকা উচিত নয়। এই ব্যবস্থা থাকলেই কর কর্মকর্তারা করদাতাদের হয়রানি করার সুযোগ পান। এ সময় তিনি বলেন, এনবিআরের মধ্যে সুশাসনের প্রচণ্ড অভাব রয়েছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রণয়নের আহ্বান জানান। তারা বলেন, গত প্রায় ত্রিশ বছর ধরেই ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আর কয়েক বছর ধরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায়ের বড় ব্যবধান থাকছে। একই সঙ্গে কর ফাঁকির বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এবং ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলও কার্যকর না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে তারা বলেন, এসব কারণে শেয়ারবাজারও সমস্যায় রয়েছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান ব্যাপক করফাঁকি নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা জানান। একই সঙ্গে কর কর্মকর্তাদের সঠিক পথে আনতে ‘হেদায়েত’ করছেন বলেও জানান। তিনি বলেন, এর ফলে কিছু ক্ষেত্রে কাজও হয়েছে। এ সময় কর ফাঁকি ও কর পরিহারের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, কর পরিহার এত বেশি! আস্তে আস্তে আরো বেড়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আইসিএবি’র আওতাধীন অডিট ফার্মগুলোর অডিট নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি বলেন, কিছু সংখ্যক কোম্পানি বাদে বেশিরভাগই প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে না। রপ্তানি খাতের কোম্পানিগুলোকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের উেস কর এখন শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। কর্পোরেট করহার মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ। কিন্তু হিসাব করে এর উেস পরিশোধ হওয়া করের চেয়ে বেশি আয় কেউই দেখায় না। বিদেশি অর্থ আসার সঙ্গে তো তাদের দেখানো আয়ের হিসাব মিলে না।  এ সময় মাত্রাতিরিক্ত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিষয়টি তুলে  ধরে তিনি বলেন, অতীতে এনবিআরের গড়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১৬ থেকে ২০ শতাংশ। অথচ এবার ৪০ শতাংশের বেশি আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। অতীতে কখনোই এত বেশি হারে রাজস্ব আদায় হয়নি। গত অর্থবছর কর্পোরেট কর কমানো হলেও তা একটি গ্রুপ পেয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যে কোনো সুবিধা দেওয়া হলে তার সুবাতাস অর্থনীতিতে আসতে হবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, পানামা পেপারসে অর্থপাচারের সঙ্গে দেশের অনেকের নাম উঠে এসেছে। এটি মূলত কর ফাঁকির কারণে।   সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন কর আদায় বাড়াতে  সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার সম্পদের উপর কর আরোপের প্রস্তাব দেন। এছাড়া ব্যক্তি করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, অটোমেশনসহ বেশকিছু প্রস্তাব তুলে ধরেন।