‘কুমিল্লা নগরীর ৯০ শতাংশ ভবন নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। তাই নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে পর্যায়ক্রমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৯টি বহুতল ভবনের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’ কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) মেয়র মো. মনিরুল হক সাক্কু নিজেই সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন।
এদিকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর অনুমোদিত নকশা বহির্ভূত, নক্শাবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে কুসিক কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। তবে প্রায় ১০ বছর আগে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিকসহ ১১০টি ভবনের তালিকা করে এগুলো ভাঙার জন্য একাধিকবার নোটিস দেওয়া হলেও সেগুলো আজো ভাঙা হয়নি। এ ছাড়া নগরীর রেইসকোর্স এলাকায় একটি চার তলা ভবনের ওপর হেলা পড়া পাঁচ তলা ভবনটি দীর্ঘ প্রায় আট বছরেও অপসারণে কুসিক কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে কুসিক কর্তৃপক্ষের এসব পদক্ষেপ আর ভবন মালিকদের বারংবার দেওয়া চিঠি/নোটিস শুধুই কাগজে-কলমে থেকে যাচ্ছে। এসব ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা পরিচালনাসহ আতঙ্কে বসবাস করছেন হাজারো মানুষ।
বর্তমানে এ সিটির জনসংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। এদিকে পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর নগরজুড়ে বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের হিড়িক পড়ে যায় এবং বিভিন্ন এলাকায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই একের পর এক ভবন নির্মিত হয়। ভবন নির্মাণে যথাযথ কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র না নিয়ে, কেউবা নক্শাবিহীন কিংবা অনুমোদিত নক্শা বহির্ভূতভাবে এসব ভবন নির্মাণ করেছেন।
সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ‘রানা প্লাজা’ ট্র্যাজেডির পর টনক নড়ে কুসিক কর্তৃপক্ষের। ওই সালে নগরীর মোট ১১০টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করে ওই ভবনগুলো অপসারণের জন্য সিটি কর্তৃপক্ষ ভবন মালিকদের বরাবরে চিঠি দেয়। এরপর একাধিকবার পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এসব ভবন ভাঙা হয়নি। পরে ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই নগরের প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়ে পূবালী ব্যাংক ভবনের কিছু অংশ ধসে পড়ে মামুন হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী আহত হন। এ ঘটনার পর কুসিক কর্তৃপক্ষের ফের টনক নড়ে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে ভাঙার জন্য ২৬ জুলাই আবারো ওই ভবন মালিকদের চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু দফায় দফায় পদক্ষেপ নেওয়া হলেও ভবনগুলো অপসারণ কিংবা ভাঙা হয়নি। ওইসব নোটিসে প্রতিবারই কুসিক কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করেছে, বেঁধে দেওয়া সময় পার হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু দিনের পর দিন, বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও এ পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো বসবাসকারীদের আতঙ্ক হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে আজো।
অপরদিকে নগরীর রেইসকোর্স এলাকায় ২০১১ সালে পাঁচ তলা বিশিষ্ট ভুঁইয়া হাউস নামের একটি ভবন পাশের একটি চার তলা বিশিষ্ট র-হাম মঞ্জিল নামের ভবনে হেলে পড়ে। এতে র-হাম মঞ্জিল ভবন মালিক রফিকুল ইসলাম হেলে পড়া ভবনটি অপসারণের জন্য ওই সালের মে মাসে কুসিক মেয়রের নিকট আবেদন করেন। এতে কুসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী ওই সালের ৯ জুন অনুমোদিত নক্শা বহির্ভূত ও অবৈধভাবে নির্মিত ভবনটি নিজ দায়িত্বে ভেঙে ফেলার জন্য হেলে পড়া ভবন মালিককে নোটিস দিয়েছিলেন।
ক্ষতিগ্রস্ত ভবন মালিক রফিকুল ইসলাম জানান, ‘হেলে পড়া ভবন অপসারণের জন্য দফায় দফায় মেয়র, নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে অনেকবার আবেদন করেছি। কিন্তু কোন কাজ হয়নি।
এদিকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সম্প্রতি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর ফের নড়েচড়ে ওঠে কুসিক কর্তৃপক্ষ। গত ৪ এপ্রিল কুসিক মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর নেতৃত্বে নক্শাবিহীন অবৈধ ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে নগরীর ঠাকুরপাড়া, নজরুল এভিনিউ, দক্ষিণ চর্থা এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জনি রায়। এ সময় ৯টি বহুতল ভবনের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। অভিযানে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপম বড়ুয়াসহ অন্যান্য কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লা শাখার সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, কুসিক কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন মালিকদের নোটিস প্রদান করে এবং ভবনের দেয়ালে ‘ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ, এ ভবনে বসবাস করা নিরাপদ নয়’ লিখে দায় এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ অমূলক নয়। কারণ নগরীর যেকোনো ভবনের নক্শা অনুমোদন এবং স্থাপনা নির্মাণকালে সীমানা দেওয়াল কিংবা সড়ক থেকে ভবনের দূরত্ব ও পার্কিং ব্যবস্থাসহ সকল বিষয় সঠিক হচ্ছে কি না তা দেখভাল করার দায়িত্ব শুধুই সিটি কর্তৃপক্ষের, অন্য কারও নয়।
কুসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মো. নুরুল্লাহ্ বলেন, ‘২০১৫ সালের ৬ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর গায়ে লাল রঙের কালি দিয়ে ‘এই ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ, এই ভবনে বসবাস করা নিরাপদ নয়’ লিখে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুমোদিত নকশা বহির্ভূত ভবনের অংশ অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট ভবন মালিকদের নোটিস দেওয়া হয়েছে।
কুসিক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু বলেন, ‘নগরীর ৯০ শতাংশ ভবন নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ভবন মালিকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৯টি ভবনের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়ে তাদেরকে জবাব দাখিলের জন্য বলা হয়েছে। কেউ যদি ভবন নির্মাণ আইন অমান্য করে তাহলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা আদায়সহ জেলহাজতে প্রেরণ করা হবে। পর্যায়ক্রমে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। এ ছাড়া হেলে পড়া একটি ভবনসহ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর ব্যাপারে সহসাই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
