চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি রাবির চার শিক্ষক হত্যা মামলা

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৫৬

গত এক যুগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) চারজন শিক্ষককে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। এসব ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার কোনোটি বিচারের একধাপ পেরিয়েছে। কোনোটি নিষ্পত্তি হয়েছে হাইকোর্টে। কিন্তু কোনো মামলারই চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি এখনো। নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচারের আশায় পথ চেয়ে আছে। তারা বলছেন, দ্রুত এসব মামলা নিষ্পত্তি করে খুনিদের ফাঁসি  কার্যকর করা হোক। ২০০৪ থেকে ২০১৬ সালের বিভিন্ন সময় রাবির মেধাবী চার শিক্ষককে খুন হতে হয়। এই চার শিক্ষক হলেন— অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূস, ড. এস তাহের আহমদ, ইংরেজি বিভাগের এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী মুকুল ও সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম শফিউল ইসলাম লিলন। সবর্েশষ গত সোমবার অধ্যাপক শফিউল হত্যা মামলায় নিম্ন আদালত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডের ওই রায় ডেথ রেফারেন্স আকারে হাইকোর্টে পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূস

২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর রাবি শাখা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ ইউনূসকে নগরীর বিনোদপুরের নিজ বাসার অদূরে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। আদালত সূত্রে জানা যায়, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূস হত্যা মামলায় ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ঘোষিত প্রথম রায়ে জেএমবির অপারেশন কমান্ডার সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের বড়ভাই রফিকুল ইসলামের মেয়ের জামাই, নওগাঁ সদর থানার সারকডাঙ্গার শহিদুল্লাহ্ ওরফে মাহবুবকে এবং রাবির আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ আসাদুল্লাহ আল গালিবের কথিত ভাগ্নে, সাতক্ষীরা সদর থানার ইটাগাছার শফিউল্ল­াহ্ তারেক ওরফে আবুল কালামকে ফাঁসির আদেশ দেন রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ। তবে অপর ৬ আসামি যথাক্রমে রাবির আরবি বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র জামালপুরের শেখেরভিটার গোলামুর রহমান ওরফে গোলাম মোস্তফা, সিরাজগঞ্জের বেলকুচির আবু ঈসা ওরফে এনামুল, বাগমারার আবুল মতিন ওরফে বোমারু মতিন ও তক্তপাড়ার জাকির ওরফে জায়েদ ওরফে জাহিদ, শিবগঞ্জের সন্ন্যাসীকুপ গ্রামের আবুল কাশেম ওরফে তুফান এবং দিনাজপুর নবাবগঞ্জের আবদুর রহমান ওরফে আরিফ ওরফে ফাহাদ ওরফে আলালকে বেকসুর খালাস দেন।

রায় ঘোষণার সময় আসামি জাকির ওরফে জায়েদ পলাতক ছিল। পরে আসামিদের আপিলের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত মামলাটির রায় পুনর্বিবেচনার আদেশ দেন। রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটির পুনরায় বিচার শুরু হয়। ২০১৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বিচারক গোলাম আহমেদ খলিলুর রহমান আগের ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত দুই জেএমবির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।

ড. এস তাহের আহমদ

২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে অধ্যাপক তাহের বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার পশ্চিম ২৩/বি বাসা থেকে নিখোঁজ হন। পরে ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে নিজ বাসার পেছনের সেপটিক ট্যাংক থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় শিক্ষক তাহেরের ছেলে সানজিদ আলভী নগরীর মতিহার থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালের ৩ জুলাই রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচার কাজ শুরু হয়। ২০০৮ সালের ২২ মে আদালত শিক্ষক মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, বাসার কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলম, জাহাঙ্গীরের ভাই শিবির কর্মী আব্দুস সালাম ও নাজমুল ইসলামের ফাঁসির আদেশ দেন। অভিযোগপত্রের অপর দুই আসামি রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের তত্কালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম সালেহী ও জাহাঙ্গীরের বাবা আজিমুদ্দিনকে বেকসুর খালাস দেন আদালত।

এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী মুকুল

২০১৬ সালের ২৩ এপ্রিল সকালে নগরীর শালবাগান এলাকায় নিজ বাড়ির অদূরে রাবির ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী মুকুলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন ২৪ এপ্রিল নিহতের ছেলে রিয়াসাত ইমতিয়াজ সৌরভ অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নগরীর বোয়ালিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন।

২০১৮ সালের ৮ মে রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শিরিন কবিতা আখতার দুই জঙ্গির ফাঁসি ও তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গিরা হচ্ছেন: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী, বাগমারায় শিক্ষক মুকুলের এলাকার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম ও বগুড়ার শিবগঞ্জের মাসকাওয়াত হাসান ওরফে আব্দুল্লাহ ওরফে সাকিব। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হচ্ছেন: নীলফামারির মিয়াপাড়ার রহমত উল্লাহ, খুনিদের আশ্রয়দাতা রাজশাহীর পবার নারকেলবাড়িয়া পূর্বপাড়ার আব্দুস সাত্তার ও তার ছেলে রিপন আলী। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত সাকিব ও যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত রহমত উল্লাহ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী জঙ্গি শরিফুল পলাতক থাকলেও সম্প্রতি তাকে র্যাব একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। পুলিশের চার্জশিটে হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত আট আসামির মধ্যে জঙ্গি খায়রুল ইসলাম বাঁধন, নজরুল ইসলাম ওরফে হাসান ওরফে বাইক হাসান এবং তারেক হাসান ওরফে নিলু ওরফে ওসমান ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।

এ কে এম শফিউল ইসলাম লিলন

২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন চৌদ্দপাই এলাকায় নিজ বাসার সামনে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে অধ্যাপক ড. এ কে এম শফিউল ইসলাম লিলনকে। গত সোমবার লিলন হত্যা মামলায় তিন আসামির ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক অনুপ কুমার। দণ্ডিতরা হলেন: রাবি ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি আবদুস সামাদ পিন্টু, কাটাখালি পৌর যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুল ইসলাম মানিক ও যুবদল কর্মী সবুজ শেখ। আসামি সবুজ শেখ পলাতক।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গিদের চোরাগোপ্তা হামলার মধ্যে অধ্যাপক শফিউল ইসলাম লিলনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় ধর্মীয় উগ্রবাদীদের দিকেই তদন্তকারী সংস্থার বিশেষ সন্দেহ ছিল। এছাড়া চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের পর ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২’ নামে খোলা ফেইসবুক একাউন্টে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে বার্তা আসে। ওই বার্তা প্রদানে জড়িত এক শিক্ষার্থীকে পুলিশ বগুড়া থেকে গ্রেপ্তারও করেছিল। এছাড়া তার দুই সহযোগীকে পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছিল। এদিকে অধ্যাপক শফিউলের ছেলে সৌমিন শাহরিদ পিতার হত্যার জন্য পরোক্ষভাবে জঙ্গিদের দায়ী করলেও র্যাবের অভিযানের পর তাদের দেখানো পথেই এগোয় পুলিশের তদন্ত।