শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য শিশু অধিকার সনদ-এর ২৭ নম্বর ধারায় প্রতিটি শিশুর শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, সামাজিক ও নৈতিক উন্নয়নের বিষয়ে তাদের পর্যাপ্ত মানসম্মত জীবন-যাপনের অধিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার দ্বারাই শিশুরা প্রকৃত মানুষে পরিণত হয়।
শিশুর অপরাধের ক্ষেত্রে ধার্য বয়সসীমা নির্ভর করে সে দেশের অপরাধ আইনের উপর। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৮২ ধারানুযায়ী ৭ বছরের নিচে কোনো শিশুর কাজকে অপরাধমূলক বলে বিবেচনা করা যাবে না। দণ্ডবিধির ৮৩ ধারানুযায়ী ৭ বছরের ঊর্ধ্বে এবং ১২ বছরের নিচে যে-কোনো শিশুর কাজকে অপরাধমূলক বলে বিবেচনা করা হবে না যদি সে বিশেষ কোনো সময় বা পরিস্থিতিতে তার কৃতকর্মের প্রকৃতি বা ফলাফল সম্পর্কে বোঝা বা বিচার করার ক্ষমতা অর্জন করে।
পিতা-মাতাই শিশুদের একমাত্র অবলম্বন। এজন্য শিশুদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অবশ্যই মধুর, বন্ধুত্বপূর্ণ, স্নেহসুলভ এবং সহজ হওয়া উচিত। প্রাথমিক অবস্থায় পিতা-মাতার প্রতি শিশুর যে মনোভাব এবং সম্পর্ক গড়ে উঠে পরবর্তীকালে সেটাই তার জীবনে প্রতিফলিত হয়। শিশুরা পিতা-মাতার উপর অধিক নির্ভরশীল। শিশুকে যদি বোঝানো যায় যে, তাকে যেমন পিতা-মাতার প্রয়োজন, তেমনি পিতা-মাতার কাছে তারও প্রয়োজন রয়েছে। শিশুরা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে পরনির্ভরতা কাটিয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস ও নির্ভরতায় পৌঁছে। যা পিতা-মাতা এবং শিশু উভয়ের জন্য সুফল বয়ে আনে। কঠোর শৃঙ্খলা শিশুদেরকে যেমন ভীতু ও হতাশ করে তোলে। অন্যদিকে শৈশবে পিতা-মাতার সঙ্গে সহজ সম্পর্ক শিশুদের প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হয়। প্রহারে ও ধমক শিশুকে দেওয়া অন্যায়। এতে তার মন সংকীর্ণ হয়ে সে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
শিশুরা তিরস্কারের ভয়ে যেমন আত্মসংযম দেখায়, তেমনি পিতা-মাতাকে খুশি করার জন্য কৌশল হিসেবে সাময়িকভাবে খারাপ কাজ করা থেকে বিরত থাকে। তিরস্কার, সমালোচনা কিংবা অন্য শিশুদের সঙ্গে তুলনা করা ইত্যাদি তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে মনকে ছোট করে দেয়। পিতা-মাতার আচরণগত প্রভাবের উপর শিশুদের সুষ্ঠু বিকাশ নির্ভর করে। শিশুরা সবসময় পিতা-মাতার আচরণ অনুকরণ করে থাকে। পিতা-মাতার আচরণ যদি খারাপ এবং রূঢ় হয় কিংবা পিতা যদি মদ্যপ হয় বা অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে তবে তা সন্তানের মধ্যে প্রতিফলন ঘটতে পারে। এজন্য সন্তানের সামনে বকাবকি বা রাগারাগি, নেশা করা বা সিগারেট খাওয়া বর্জনীয়। শিশুদের সামনে মাতা-পিতার ঝগড়া বিবাদ অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে শিশুর মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে যা ভবিষ্যতে তার সুষ্ঠু বিকাশের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। পিতা-মাতার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে তাদের প্রতি আনুগত্য ও শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে ফেলে। এজন্য পিতা-মাতাকে ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করা প্রয়োজন। শিশুর কথা মন দিয়ে শুনে তাদের সঙ্গে খেলতে, হাসতে এবং দৌড়াতে হবে। শিশুকে প্রাধান্য দিলে তাদের ব্যক্তিত্বের সুষ্ঠু বিকাশ ঘটে।
আচরণের ক্ষেত্রে শিশুদের উপর কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। প্রয়োজনে ক্ষেত্রবিশেষে তাদেরকে শাসন এবং সোহাগও করতে হবে। শিশুরা যাতে পড়ার সময় পড়া, খেলার সময় খেলা, খাওয়ার সময় খাওয়া এবং ঘুমানোর সময় ঘুমাতে পারে সে বিষয়ে দৃষ্টি রাখতে হবে। অর্থাত্ তাকে নিয়মানুবর্তিতা এবং শৃঙ্খলার মধ্যে রাখতে হবে। তবে তা অবশ্যই কঠোর পর্যায়ে নয়।
সম্প্রতি চাইল্ড উইশ নামে এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা গেছে, ৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুরা বেশিরভাগ সময় কাটায় স্মার্ট ফোন, টিভি বা কম্পিউটারে। গবেষকদের মতে, এত সময় ধরে পর্দায় চোখ রাখলে শিশুদের মনোযোগ ছোট হয়ে যায়। এতে স্বাস্থ্যগত নানা ধরনের সমস্যায়ও ভুগতে পারে শিশুরা। আর প্রযুক্তির কারণে যৌন কৌতূহলও তাদের নানাভাবে বিপর্যস্ত করছে। এজন্য কম্পিউটারে বসার ব্যাপারে তাদের সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। তা না হলে কেবল শারীরিক ও মানসিক জটিলতার পাশাপাশি তারা সামাজিক সমস্যারও কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
বর্তমানে একের পর এক নৃশংস ও বীভত্স কায়দায় শিশু হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। এগুলোকে কোনোভাবেই বিছিন্ন ঘটনা বলার সুযোগ নেই। মানুষের অমানবিক, নিষ্ঠুর এই আচরণের পিছনে কাজ করছে নির্যাতনকারীদের শাস্তি না হওয়া। সামাজিক মূল্যবোধের অভাব, আইনের সঠিক প্রয়োগ ও ব্যবহার না করা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে তাকিয়ে না থেকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে সমাজকে শিশুবান্ধব করতে হবে।
শিশুদেরকে সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠা এবং তারা যাতে নির্যাতিত না হয় সে ব্যাপারে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে নিঃস্বার্থভাবে তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। শিশুরা যেভাবে নির্যাতিত হচ্ছে সেই অমানবিকতার বিরুদ্ধে আমাদের সবারই সোচ্চার হওয়া দরকার। আইনি প্রতিকারের দায়িত্ব সরকারের হলেও নির্যাতন, নিপীড়ন, সহিংসতা ও বর্বরতা থেকে শিশুদেরকে রক্ষা এবং আগামী দিনের সম্ভাবনাময়, চরিত্রবান ও উত্পাদনশীল নাগরিক তৈরির দায়িত্ব আমাদের সবার। আসুন আমরা সবাই মিলে সঠিকভাবে সেই দায়িত্ব পালন করি।
n লেখক :সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা
