কৃষি

হাওরে বোরো সংগ্রহে কৃষকের শঙ্কা কাটাতে হবে

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ২২:০৪

বাংলাদেশের একটি বিশেষ অঞ্চল হলো হাওর। আর হাওরের একমাত্র ফসল হলো বোরোধান। সেই ফসলটি যখন সে এলাকার কৃষকেরা সঠিকভাবে ঘরে তুলতে পারে না, তখন তারা নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার ভয়ে হতাশ ও শঙ্কিত হয়ে পড়ে। কারণ আমরা জানি, হাওর এলাকা  বছরে ৭-৮ মাস ধরেই পানির নিচে তলিয়ে থাকে। আর ৪-৫ মাস সময় মাত্র পানি একটু কম থাকে। সে সময়েই বোরো আবাদ করা হয়ে থাকে। তাছাড়া বোরোধান আবাদের মাধ্যমে তাদের ফসল ঘরে তোলার সময়েই বিপত্তি দেখা দেয়। কারণ সেসব অঞ্চলের বোরোধান কাটার সময়েই নিয়মিত কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দেয়। তার মধ্যে রয়েছে- আগাম বন্যা, রোগ-পোকামাকড়ের আক্রমণ, শিলাবৃষ্টি, ঝড়-বাদল ইত্যাদি।

ইতোমধ্যে এবছর (২০১৯) হাওরে বোরা ধান কাটা শুরু হয়েছে। ধানকাটার এ মৌসুমেই কৃষকদের  মধ্যে একপ্রকার অজানা শঙ্কা ও হতাশা বিরাজ করছে। এর প্রধান প্রধান কারণগুলো উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু মূল বিষয় হলো নিরাপদে ধানগুলো ঘরে তোলা।

একসময় বোরো আবাদের পুরোটা ছিল দেশিজাতের ধান দিয়ে। কিন্তু দেখা গেছে, দেশি জাতের এসব ধানের ফলন কম হওয়ায় তার পরিবর্তে আবাদ শুরু হয় আধুনিক ব্রি ও হাইব্রিড জাতের ধান। তবে অন্যান্য উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ধান আবাদের মধ্যে বেশিরভাগই ব্রিধান ২৮ জাতের। আর ব্রিধান ২৮ জাতের ধান একদিকে যেমন উফশী  অপরদিকে সেটি হাওর এলাকার জন্য উপযোগী। কারণ এ জাতের ধানের জীবনকাল অন্যান্য উফশী ধানের জাত হতে কম। সেজন্য হাওরের বেশিরভাগ এলাকায় বোরো মৌসুমে ব্রিধান ২৮ জাতের আবাদের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।

কিন্তু ব্রিধান ২৮ জাতের ধান মাঠপর্যায়ে আবাদের জন্য অনুমোদন পেয়েছে প্রায় ৩০ বছর আগে। একটি ফসল মাঠে যত বেশিদিন আবাদ হয়ে থাকে সেটিতে রোগ পোকা-মাকড়ের আক্রমণ তত বেশি হয়ে থাকে। সেভাবে ফলনও কমতে থাকে। এবারে হাওরেও আসলে তাই হয়েছে। একদিকে মাঠে খরা থাকার কারণে সঠিক সময়ে কৃষক সেচ দিতে পারেনি, অপরদিকে ব্রিধান ২৮ জাতের ধানের আবাদের কারণে মাঠে ধানে চিটা হয়েছে বেশি এবং মারাত্মক ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ বেড়েছে, যার ফলে ফলন অনেক কম হচ্ছে।

এটির সঠিক সমাধানও রয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা বলতে এখন আর কিছু নেই। সেটি সম্ভব হয়েছে সঠিক কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। উফশী জাতের স্বল্পমেয়াদি জাতের ধান, গম, আলু, ডাল, তেল, সবজি ইত্যাদি ফসলের নতুন নতুন জাত আবিষ্কার করে তা সেসব এলাকায় আবাদের ব্যবস্থা্পনা করেই তার সমাধান সম্ভব হয়েছে। হাওরও যেহেতু বাংলাদেশের কৃষিতে বিশেষত ধান উত্পাদনে একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে থাকে সেজন্য সেখানকার কৃষি ব্যবস্থাপনা নিয়েও এখন কাজ শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) প্রতিনিয়ত সারাদেশের চাহিদা মেটানোর জন্য সময় ও স্থান উপযোগী বিভিন্ন ধানের জাত আবিষ্কার করছে। কাজেই যেহেতু এখন হাওরের আবাদে অধিক উপযোগী ব্রিধান ২৮ চাষাবাদে কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। কাজেই কৃষিবিজ্ঞানীদের পরামর্শ হলো—এখন সর্বশেষ অবিষ্কৃত ব্রিধান ৮১ ধান সেসব এলাকায় আবাদ করা যেতে পারে। আর সেসব অঞ্চলের কৃষকের মোটিভেশনের জন্য তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সকল পর্যায়ের সরকারি বেসরকারি সম্প্রসারণ কর্মীদের এগিয়ে আসতে হবে। তাতে মঙ্গার মতো হাওরের সমস্যাকে দূর করা সম্ভব হবে। কৃষকের মুখে হাসি ফুটলেই দেশ আরো অগ্রসর হবে।

n লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার,

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়