মিটারপ্রতি ফি ৪৫০ টাকা আদায় ৪ থেকে ৭ হাজার

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ২২:৫১

পঞ্চগড়ে পল্লী বিদ্যুত্ সংযোগ পেতে গ্রাহকের মিটারের জামানত ও সদস্য ফি বাবদ ৪৫০ টাকা জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু এখানে এ সংযোগ পাওয়ার জন্য গ্রাহককে মিটার প্রতি ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের নামে স্থানীয় দালালরা এই টাকা আদায় করেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তির সিন্ডিকেট এ টাকা উত্তোলন করে। উত্তোলনকৃত টাকার কিছু অংশ ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের দিয়ে অবশিষ্ট টাকা ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাঙ্গা ইউনিয়নের বন্দিরামসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগে জানা গেছে, শত শত গ্রাহকের কাছ থেকে শালডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য অবিনাশ চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মান্নান, দামানীগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রেজাউল করিম, নব কুমার, হাবিবুর রহমান হবি, মজনুসহ কতিপয় দালাল গ্রামের প্রত্যেক গ্রাহকের কাছ থেকে ৪ হতে ৭ হাজার টাকা উত্তোলন করে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিদ্যুত্ লাইন নির্মাণ হলেও উল্লিখিত লোকজন বিদ্যুত্ আনার জন্য পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির নির্বাহী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারসহ বিভিন্ন কর্মকর্তাকে উেকাচ দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে এসব টাকা উত্তোলন করে বলে গ্রামবাসীরা জানিয়েছে। টাকা না দিলে বিদ্যুত্ সংযোগ না পাওয়ার ভয়ে গ্রাহকদের অনেকেই ধার-কর্জ করে, সুদের ওপর টাকা নিয়ে এবং বিভিন্ন সমিতি ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে টাকা পরিশোধ করেছেন। শুধু এই এলাকাতেই নয় দেবীগঞ্জের কলোনীপাড়া, হাতিডুবা, ফুলপুকুরী, বানুরহাট, খারিজা কাটনহারী গ্রামের অনেক গ্রাহকের কাছ থেকেও অবিনাশ মেম্বার মিটার প্রতি ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা করে উত্তোলন করেন। ওই চক্রটি কমপক্ষে ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে এলাকাবাসী।

জানা গেছে, রাজশাহীর জি এম ট্রেডার্স কনস্ট্রাকশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই কাজটির দায়িত্ব পায়। এ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. গোলাম মোস্তফা কাজটি করার দায়িত্ব দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের মো. আসাদুল আলমকে। আসাদুল আলম কাজটি আবার চুক্তিতে করতে দিয়েছেন দিনাজপুরের আত্যোনাথ নামে এক ব্যক্তিকে। গত বছরের ১৯ এপ্রিল এই প্রতিষ্ঠানকে ২৪০ দিনে মধ্যে কাজ শেষ করার শর্তে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সময় বর্ধিত করা হয়।

 দেবীগঞ্জের শালডাঙ্গা ইউনিয়নের বন্দিরাম গ্রামের কয়েকজন অধিবাসী জানায়, প্রত্যেক মিটার প্রতি ৫ হাজার টাকা করে দিতে এলাকাবাসীকে চাপ দেওয়া হয়। পরে সাড়ে ৪ হাজার টাকা চূড়ান্ত করা হয়। সম্পূর্ণ টাকা না দেওয়ায় কাজ বন্ধ রয়েছে। পোল নির্মাণ, তার টানানোর কাজ শেষ করা হলেও মিটার সংযোগ দেওয়া হয়নি। ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির তথ্যমতে সরকারের শতভাগ বিদ্যুতায়নের অংশ হিসেবে পঞ্চগড়ে কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। এর মধ্যে ২ টি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সরকারের প্রতিশ্রুতি মতে প্রত্যেক গ্রাহকের বাড়িতে বিনা খরচেই বিদ্যুত্ পৌঁছে দেওয়ার কথা। শুধু মিটারের জামানত ৪০০ টাকা ও সদস্য ফি ৫০ টাকা সরকারি খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে।

শালডাঙ্গা ইউনিয়নের বন্দিরাম গ্রামের আছিয়া খাতুন (৪৫) নামের এক নারী গ্রাহক জানান, বিদ্যুত্ সংযোগের জন্য প্রতি মাসে ৫শ টাকা হারে সুদ দিয়ে ২ হাজার এবং বাঁশ ও হাঁস মুরগি বিক্রি করে আড়াই হাজার মোট  সাড়ে চার হাজার টাকা দিতে হয়েছে স্থানীয় ওই মেম্বার কর্তৃক নিয়োগকৃত দালালদের হাতে। তার ও খুঁটির দেখা মিললেও এখনো বাতি জ্বলেনি তার বাড়িতে। এই গ্রামেরই ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ হেরামোহন জানান, টাকা দিতে না পারায় আমার বাড়িতে বিদ্যুত্ লাইন পোল, ওয়্যারিং কোনোটাই হয়নি।

এ ব্যাপারে দামানীগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রেজাউল করিম জানান, ঠিকাদার, ইলেক্ট্রিশিয়ান এবং অন্যান্য খরচের জন্য ৪ হাজার করে টাকা তোলা হয়েছে। তবে পুরো বিষয়টি দেখভাল করছেন মেম্বার অবিনাশ ও মান্নান। আমার কাছে কিছু টাকা জমা আছে। বাকি টাকা তারা দু’জন নিয়ে কি করেছে আমি জানি না। পল্লী বিদ্যুতের কথিত অনুমোদিত ইলেক্ট্রিশিয়ান আব্দুর রহমানের সহকারী মজনু মিটার প্রতি ২ হাজার টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাঙ্গা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য অবিনাশ চন্দ্র রায় টাকা উত্তোলনের কথা স্বীকার করলেও তিনি নিজে কোনো টাকা লেনদেন করেননি বলে জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে ঠিকাদার আসাদুল আলম জানান, আমি কোনো টাকা পয়সা নেইনি। আমার নাম ভাঙিয়ে কেউ নিতে পারে।

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল ইসলাম জানান, পল্লী বিদ্যুত্ সংযোগের জন্য গ্রাহককে মিটারের জামানত ও সদস্য ফি এই দুই খাতে ৪৫০ টাকা দিতে হয়। এর বাইরে এক টাকাও কোথাও লাগে না। পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি (পোল), বৈদ্যুতিক তার, মিটার ও মিটারে সংযোগের কাজ ঠিকাদারের মাধ্যমে করে পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি। কার্যাদেশের পর ঠিকাদার তার নিজ দায়িত্বে পোল, তার, মিটারসহ মালামাল নিয়ে গিয়ে কাজ করবেন। তিনি আরো জানান, দালালরা গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা উত্তোলন করে ঠিকাদারকে ঘুষ দিলে দায়দায়িত্ব পল্লী বিদ্যুত্ নেবে না।

ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আবু আরাফ মো. সালে্হ জানান, নতুন বিদ্যুত্ সংযোগ নিতে মিটারের জামানত ও সদস্য ফি ছাড়া আর কোনো টাকা-পয়সা লাগে না। পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্তসাপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।