ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের গত এক দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ। ভারতের জাতীয় নির্বাচনের প্রতিবেশী দেশ হিসেবে গড়ে ওঠা এই সম্পর্কের গতি কোন দিকে যেতে পারে এ নিয়ে বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন করেছে। ওই প্রতিবেদেনে বলা হচ্ছে বাংলাদেশ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। এই সময়ে দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়, ভারতকে সড়কপথে ট্রানজিট দেওয়া, চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়াসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে চুক্তি হয়েছে। ভারতের জাতীয় নির্বাচনের পরে দেশটিতে সরকার ও নীতি বদলে গেলে তার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও। সে কারণে ভারতের নির্বাচনের দিকে ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘দুই দেশের মধ্যকার সব অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে আমাদের আলোচনা চলছে। এবং ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, আমি বিশ্বাস করি তাদেরও এটা প্রায়োরিটি দিয়ে বিবেচনা করা উচিত, যেহেতু বাংলাদেশ তাদের একজন ভালো বন্ধু, সময়ে অসময়ে আমরা ভারতের পাশে ছিলাম থাকব। আমাদের সমস্যাগুলোর সমাধানও কিন্তু তাদের সেভাবে বিশেষ নজর দিয়ে দেখতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা তাদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছি। যে দলই নির্বাচিত হবে, তার সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সরকারের সুসম্পর্ক থাকবে।’
এদিকে, ভারত প্রশ্নে বাংলাদেশের আরেক প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির অবস্থান বেশ ভিন্ন। যদিও দলটির রাজনীতিতে কথিত ‘ভারত বিরোধিতা’ একটা অন্যতম দিক, এমন কথা বলা হলেও গত কয়েক বছর ভারত প্রসঙ্গে প্রায় নীরব ছিল বিএনপি। কিন্তু এ বছরের শুরুতে সীমান্ত হত্যা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে একটি বিবৃতি দেয় দলটি। যদিও সম্পর্ক উন্নয়নে গত এক দশকে বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা ভারত সফর করে বিজেপি ও কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছেন।
ভারতের নির্বাচন পরবর্তী সর্ম্পকের বিষয়ে বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক রুমিন ফারহানা বলছেন, এখন ভারতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সীমান্ত হত্যাসহ দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানে তারা গুরুত্ব দেবে, এমনটাই প্রত্যাশা তার দলের। তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে, ভারত একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি একটু বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে থাকে।’
রুমিন আরো বলেন, ‘এই নির্বাচনে কংগ্রেস বা বিজেপি বা তৃতীয় শক্তির কোনো জোট যেই ক্ষমতায় আসুক, আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, তিস্তাসহ বেশ কয়েকটি নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আমাদের যে অস্বস্তি আছে, ভীষণ রকম বাণিজ্য বৈষম্য আছে, সেগুলো সমাধানে ভারত মনোযোগী হবে।’ তিনি বলেন, তবে সরকারের পক্ষ থেকে দুদেশের সম্পর্কে ব্যাপক অগ্রগতির কথা বলা হলেও, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বেশ বড়। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ২৪ লাখ কোটি টাকার বেশি।
অপরদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন লোকসভা নির্বাচনের প্রচারণায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, ‘ভারতে যদি বিজেপি আবার ক্ষমতায় আসে, অনেকেই ভাবছে তাদের হিন্দুত্ববাদের যে রাজনীতি, তা আরো বেড়ে যাবে। আর সেটা বাড়লে কয়েকটা জায়গায় বিশেষ করে আসামে বা উত্তর-পূর্ব ভারতে ইতিমধ্যেই যে পদক্ষেপগুলো তারা নিয়েছে, সেটা আরো বাড়বে। একই সঙ্গে ভারতে ধর্মভিত্তিক দলের বিজয় যদি হয়, হিন্দুত্বের যদি বিজয় হয়, তাহলে বাংলাদেশে যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে, তারা ভাবতে পারে যে ভারতে হতে পারলে বাংলাদেশে কেন নয়! এ ধরনের প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে।’
অধ্যাপক আহমেদ আরো বলছেন, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণে ভারতের সরকার পরিচালনায় কোন দল আসছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভারতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, বাংলাদেশকে নিজের জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা এবং বাণিজ্য ঘাটতির মতো অমীমাংসিত বিষয়ের সমাধানে নজর দিতে হবে।
